Home / কক্সবাজার ভ্রমন / একটি অসাধারণ ফ্যান ফিকশন “কুমিল্লায় ফেলুদা”
কুমিল্লায় ফেলুদা

একটি অসাধারণ ফ্যান ফিকশন “কুমিল্লায় ফেলুদা”

কুমিল্লায় ফেলুদা

মাসুদ সরকার রানা

 

 

প্রচ্ছদ

মিনহাজ উদ্দিন ও রবিউল ইসলাম সুমন

 

 

প্রকাশ কাল

অক্টোবর ২০১৫

 

 

 

উৎসর্গ :-

আমার সকল অনলাইন বন্ধুদের যাদের কারণে আমি আজকের পর্যায়ে আসতে পেরেছি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

©লেখক কর্তৃক সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

মুখবন্ধ

২০০৬ সালে ঢাকায় বেড়াতে গিয়ে দেখলাম মামার টেবিলে একটি বই পরে আছে। নাম ফেলুদার পাঞ্চ। দুরু দুরু বুকে বইটা হাতে নিলাম। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর তেমন ভাল লাগে নি। তারপরও কেমন জানি এক অজানা আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। পরের দিন আবারও পড়তে বসলাম। এরপর যতই পড়ছি ততই ভাল লেগেছে। শুধু ফেলুদার পাঞ্চ বইটিই ১০ বারের বেশি পড়েছি। একে একে ফেলুদা সিরিজের সব বই ই পড়া হয়েছে। ফেলুদা সিরিজ এত ভাল লাগে যে নিজেই একটা লিখতে বসে গেলাম। বইটি আমি ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে লিখি নি। শুধু ফেলুদার প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করতেই লিখেছি। আমি ঘুণাক্ষরেও ভাবি নি আমার দ্বারা এমন একটি বই লিখা সম্ভব হবে।

 

সত্যজিৎ রায় ও কাজী আনোয়ার হোসেনের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বইটি লেখার চেষ্টা করেছি। সত্যজিৎ রায়ের গল্পে দেখা যায় যে ফেলুদা কোথায়ও বেড়াতে গিয়ে রহস্যে জড়িয়ে যায়, লালমোহনবাবু অশুদ্ধ ইংরেজি বলেন, তপেশ অসম্ভব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। এ ছাড়া দেখা যায় যে জটায়ুর কোন কাজের মাধ্যমে ফেলুদা নতুন ক্লু পেয়ে যায়। আমি এই ফরম্যাট বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। আমরা সচরাচর মাসুদ রানাকে যেভাবে দেখি এই গল্পে তারচেয়ে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

বইটির মনোয়ন্ননে অনেক সুধীজনই তাদের বিজ্ঞ মতামত প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় অনলাইন বড় ভাই জুনায়েদ কবির এর পরামর্শে বেশ কিছু জায়গায় সম্পাদনা করা হয়। প্রচ্ছদ ডিজাইন করতে অনেক পরিশ্রম করেন মিনহাজ উদ্দিন ও রবিউল ইসলাম সুমন ভাই। আমি সবার নিকটই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। গল্পের পটভূমি হিসেবে আমার প্রিয় মাতৃভূমি কুমিল্লাকেই বেছে নিয়েছি। গল্পে বর্ণিত স্থান সমূহ বাস্তবিক। কাহিনী, চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবে কারও সাথে মিলে গেলে আমি দায়ী নই।

 

পরিশেষে বইটি পড়ে কারও যদি বিন্দুমাত্র ভাল লাগে তখনই আমার এই পরিশ্রম সার্থক হবে।

 

 

 

 

 

বিনীত

মাসুদ সরকার রানা

ইমেইল – acimasud@yahoo.com

 

 

সবটা একসাথে পিডিএফ আকার পড়তে চাইলে এখান থেকে ডাউনলোড করে নিন।

ফেলুদা প্যারিস থেকে ফিরেছে আজ। একটা কেসের জন্য ফেলুদাকে সেখানে যেতে হয়েছিল। ওখানে একটা বোমা হামলা হয়। সেটার দোষ চাপানো হয় স্থানীয় মুসলমানদের উপর। ফলে প্যারিসের স্থানীয় মুসলমানদের অনুরোধে তদন্তের জন্য ফেলুদাকে সেখানে যেতে হয়েছিল। ও বাসায় এসে পৌঁছে দুপুর ১২ টায়। এসেই সে কি ঘুম। যেন ঘুমানোর প্রতিযোগিতা করছে। আমি অনেক ঠেলে ঠুলেও ওকে ঘুম থেকে তুলতে পারি নি। ওকে জাগাতে না পেরে শেষে আমি একাই বিকেল বেলায় আড্ডা মারতে বেড়িয়ে পরি। সন্ধ্যা ৭ টায় বাসায় ফিরে দেখি ফেলুদা ওর প্রিয় ল্যাপটপ নিয়ে ইন্টারনেটে ব্যস্ত হয়ে পরেছে। আমি রুমে ঢুকতেই ও আমার দিকে না তাকিয়েই বলল কই ছিলি এতক্ষণ? বললাম তোমাকে ঘুম থেকে জাগাতে না পেরে বিকালে আমি একাই দোকানে বেরিয়ে পরি। ফেলুদা বলল জানিস প্যারিস যতই ঝাঁক ঝমক-পূর্ণ হউক না কেন কলকাতার টানই আলাদা। মানুষ দেশে থাকতে কলকাতাকে যতই গালি দেউক না কেন দূরে গিয়ে ঠিকই তার কাছে কলকাতাই সেরা।

 

আইফেল টাওয়ারের সামনে দাড়িয়ে থাকলেও কলকাতার খোলা ডাস্টবিন, টোকাই, জ্যাম, গরমের কথাই মনে পরে। অভিজাত রেস্তোরায় বসে মনে পরে কলকাতার গলির চায়ের দোকানের ময়লা কাপ গুলোর কথা। একই কাপ দিয়ে কত হাজার হাজার মানুষ চা খাচ্ছে। আমি বললাম তোমার লেকচার থামাও। আগে শুনি প্যারিসের ঐ মামলার কি খবর।

ফেলুদা বলল তোপসে জানোস তো আজকাল মানুষ কতটা প্রতি হিংসা পরায়ণ হয়ে উঠছে। ইহুদীরা বোম ফেলে তার দায় মুসলমানদের কাঁধে চাপাতে চেয়েছিল। দুনিয়ার সব সংবাদপত্র ইহুদীরাই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মুসলমানদের উপর দায় চাপানো খুবই সহজ হয়ে যায়। তদন্ত না করলে কিন্তু মুসলমানরা রেহাই পেত না। মুসলমানদেরকে জঙ্গি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হত। তদন্তের ফলে সব বেরিয়ে আসে। পৃথিবীর সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ জাতি এই ইহুদীরা। ঈশ্বর তাদেরকে যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু তাদের হঠকারিতার কারণে ঈশ্বর প্রদত্ত নেয়ামত তুলে নেওয়া হয়। ফেলুদা যখন আমার সাথে এসব বলছিল তখন হঠাৎ একটি নোটিফিকেশনের আওয়াজে ও ফের ল্যাপটপের মনিটরের দিকে মনোযোগ দিল। একটা ইমেইল এসেছে। ফেলুদা ইমেইলটা ওপেন করে পড়া শেষ করে বলল মাসুদ রানা ইমেইল করেছে।

আমি বললাম মাসুদ রানা কে?

ফেলুদা বলল তুই আজকাল বড় অলস হয়ে যাচ্ছিস। বাহিরের খোজ খবর কিছুই রাখস না। মাসুদ রানা আরেক বিখ্যাত বাঙ্গালি গোয়েন্দা। রানা এজেন্সীর প্রধান। প্যারিসে আমার সাথে রানাও তদন্ত করেছিল। দুজনেই বাঙালি। কাজেই বন্ধুত্ব হতে দেরি হয় নি। যদিও আমরা দুজনেই আগে থেকে একে অপরকে চিনতাম। শুধু চেহারাটার সাথেই পরিচিত ছিলাম না।

আমি বললাম গোয়েন্দা মাসুদ রানা নামটার সাথে আমিও পরিচিত। কিন্তু তোমাকে যে ঐ মাসুদ রানাই ইমেইল করেছে সেটা কি আমি জানতুম?

ফেলুদা বলল ইমেইলে কি লিখেছে পড়েই দেখ না।

আমি চোখ বড় বড় করে মনিটরের দিকে তাকিয়ে ইমেইল পড়তে লাগলাম।

“বিখ্যাত গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র সমীপে,

আশা করি পরম করুণাময়ের কৃপায় ভাল আছেন। আপনার খ্যাতির কথা আগে থেকেই জানতাম। প্যারিসে আপনার সাথে একই মামলায় কাজ করতে গিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সে বন্ধুত্বের খাতিরেই আপনাকে আমার কর্মস্থল বাংলাদেশের কুমিল্লা সেনানিবাসে আসার আমন্ত্রণ জানালাম। আশা করি কুমিল্লা সেনানিবাসে আপনার পদধূলি দিয়ে বাধিত করবেন। আপনার জবাবের অপেক্ষায় রইলাম।

ইতি

মাসুদ রানা”।

 

ইমেইল পড়ে ফেলুদাকে বললাম যাবে নাকি বাংলাদেশ?

ফেলুদা বলল তোর কি আমাদের পূর্ব পুরুষদের দেশে যেতে ভয় লাগে নাকি?

এখানে বলে রাখা ভাল যে আমাদের বাবা, চাচারা আগে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে থাকত। দেশ বিভাগের সময় ঘর বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। তখন বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানীরা ২৪ বছর শাসন করে। বাংলাদেশের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে যেতেই তারা প্রহসন শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশী জনতা ছিল প্রতিবাদী। ফলে শুরুতেই তারা এই বর্বর শাসনের প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ এক সময় যুদ্ধে পরিণত হয়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

আমি বললাম যেতে ভয় লাগবে কেন? তুমিই তো নিয়ে জাওনা।

ফেলুদা বলল তাহলে তৈরি হয়ে থাক। এই সপ্তাহের মধ্যেই আমরা কুমিল্লা যাব। এমন সময় ক্রিং ক্রিং করে কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলে দেখি জটায়ু এসেছেন। ঘরে ঢুকেই বললেন মশাই আপনি এসেছেন শুনে আর বসে থাকতে পারলাম না। এই রাত বিরাতেই চলে আসলাম। ফেলু মিত্তির ছাড়া কলকাতায় কেমন যেন মন আনচান করে। আপনি সাথে থাকলে কখন সময় কেটে যায় বুঝাই যায় না।  ঘুরেই ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন তো মশাই আপনার প্যারিসের কেসের কি হল?

ফেলুদাকে বাধ্য হয়েই আবার প্যারিসের কেসের ঘটনা বলতে হল। শুনে জটায়ু বললেন সাব্বাস। আপনি ব্যর্থ হলে কলকাতার মান ইজ্জত যেত।

ফেলুদা বলল মি জটায়ু, শীতের মৌসুম তো চলছে। একটা ট্যুর দিলে কেমন হয়?

ট্যুরের কথা শুনেই জটায়ু প্রায় সোফা থেকে লাফিয়ে উঠলেন। হাতের তেলোতে ঘুসি মেরে বললেন, অনেক দিন ধরে কলকাতার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। আপনি ২ দিনের কথা বলে সেই যে প্যারিস গেলেন ফিরলেন ১৫ দিন পর। শেষটায় আপনার উপর বিরক্ত হয়ে একাই জয়দেবপুর যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম। এরই মাঝে আপনি আজ এলেন। তো কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করলেন?

ফেলুদা বলল বাংলাদেশ। জটায়ু বলল তো মশাই কোন কেস টেস জুটেছে নাকি? ফেলুদা বলল না কোন কেস নেই। এমনিতেই বেড়াতে যাচ্ছি।

জটায়ু উত্তেজিত হয়ে বললেন, মশাই আমার নাড়ির টান বাংলাদেশে। একবার যেতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু পত্র পত্রিকায় পড়েছি ঐখানের পরিস্থিতি ভাল না, আইন শৃঙ্খলার মারাত্মক অবনতি। পুলিশের সামনেই ধর্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশ ধর্ষকদের গার্ড হিসেবে কাজ করেছে। আমার তো ধারনা ঐখানে গেলে জান নিয়ে টানাটানি শুরু হবে।

ফেলুদা স্লান হেসে বলল আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমি একজন গোয়েন্দা। তার উপর মাসুদ রানা যদি সাথে থাকে তাইলে এইসব ছিচকে মাস্তানদের সাধ্য আছে কি প্রদোষ মিত্রের একটা চুল নাড়া দেয়?

জটায়ু চোখ গোল করে বললেন কোন মাসুদ রানা?

ফেলুদা বলল বিখ্যাত গোয়েন্দা মাসুদ রানাকে চিনেন না?

জটায়ু বলল গো….গোয়েন্দা মাসুদ রানা! রানার কথা আমার প্রকাশকের কাছ থেকে শুনেছি। কিন্তু তাকে আপনি পাচ্ছেন কই?

ফেলুদা শান্ত স্বরে বলল স্বয়ং মাসুদ রানা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে তার ঐখানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে। এই যে দেখুন না ইমেইল করেছে।

জটায়ু চোখ বড় বড় করে ল্যাপটপের দিকে ঝুঁকে রানার ইমেইল পড়তে লাগল। ফেলুদা বলল গোয়েন্দা ছাড়াও মাসুদ রানার আরেকটা পরিচয় আছে। সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল।

ফেলুদা, জটায়ু, ও আমার পাসপোর্ট করাই আছে। আজ বুধবার। সিদ্ধান্ত হল আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হব আগামী রবিবার।

ফেলুদা রানার ইমেইলের রিপ্লাই দিল।

“রানা এজেন্সি প্রধান মাসুদ রানা সমীপে,

আপনার ইমেইল পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আমি আগামী রবিবার আপনার দেশে আসছি। আমার সাথে থাকবে রহস্য রোমাঞ্চ ঐপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু ও আমার চাচাতো ভাই তপেশ চন্দ্র।

ইতি

প্রদোষ চন্দ্র মিত্র”।

 

**************

 

রবিবার সকালেই জটায়ু আমাদের বাসায় এসে হাজির। ফেলুদা আগেই এয়ার ইন্ডিয়ার কলকাতা অফিসে ফোন করে টিকেট বুকিং দিয়ে রেখেছিল। আমাদের ফ্লাইট বেলা ১১ টায়। কাজেই সকাল সকালই রওনা হতে হবে। কলকাতা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতে হবে লালমোহনবাবুর গাড়িতে করে। ফেলুদা স্লান সেরে এসে শ্রীনাথকে চা দিতে বলল। একটু পর শ্রীনাথ ৩ কাপ চা নিয়ে এলো। চা পর্ব শেষ করে তাড়াতাড়ি করে তৈরি হয়ে নিলাম। সাথে ব্যাগে নিলাম প্রয়োজনীয় শীতের কাপর, বডি স্প্রে, হেয়ার জেল, ক্যামেরা। সব গুছিয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠতেই হরিপদবাবু গাড়ি স্টার্ট করে দিলেন। আমরা কলকাতা এয়ারপোর্টে গিয়ে পৌঁছলাম বেলা ১০ টায়। আমি আর লালমোহনবাবু টার্মিনালে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ফেলুদা গেল এয়ার ইন্ডিয়ার অফিসে। এয়ার ইন্ডিয়ার কলকাতার অফিস এয়ার পোর্টের পাশেই। কাউন্টার ম্যানেজার ফেলুদার পরিচিত। ২০ মিনিট পর ফেলুদা টিকেট নিয়ে ফিরে এলো। এরপর আমরা এন্ট্রি জোন পের হয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং বিমানের বিজনেস ক্লাস সিটে গিয়ে বসলাম।

 

কিছুক্ষণ পর ক্রু ঘোষণা দিল স্বল্পক্ষণের মধ্যেই বিমান আকাশে উড়তে যাচ্ছে। আপনার সবাই নিজ নিজ সীট বেল্ট বেধে নিন। ঠিক কাটায় কাটায় বেলা ১১ টার সময় বিমানটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আমরা যখন ঢাকা হযরত শাহ জালাল এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলাম তখন বেলা ১১:৪০। স্বয়ং রানা এয়ারপোর্টে এসেছেন আমাদেরকে রিসিভ করার জন্য। আমাদের সাথে হালকা পাতলা ব্যাগ। তাই কাস্টমস ক্লিয়ার করতে বেশি সময় লাগে নি। তার উপর সাথে রানা। ও আমাদেরকে দেখেই আন্দাজ করে নিয়েছে কোনটা জটায়ু আর কোনটা তপেশ চন্দ্র। তাতে ফেলুদাকে আলাদা করে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হয় নি। কাস্টমসের কাজ সেরে এয়ারপোর্টের হোটেলে লাঞ্চ সেরে ভিআইপি টার্মিনাল দিয়ে বের হয়ে আসলাম। রানা গাড়ি নিয়েই এয়ার পোর্টে এসেছে। তাই আমাদেরকে বাসের লক্কড় ঝক্কর ধকল সইতে হয় নি। অবশ্য এখন ঢাকা থেকে কুমিল্লা যাওয়ার জন্য অনেক বিলাস বহুল এসি বাস পাওয়া যায়। ড্রাইভ করছে রানা নিজেই। ফেলুদা বসেছে সামনের সিটে রানার পাশে। আমি আর জটায়ু বসেছি পিছেনের সিটে। গাড়ি এয়ার পোর্টের রাস্তা পেরিয়ে মহাসড়কে উঠতেই রানা বলল মিঃ মিটার অপরাধ নেবেন না। জ্যাম আমাদের এখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যপার। এমনও হতে পারে যে কুমিল্লা যেতে যেতে রাত ১০ টাও বাজতে পারে।

 

ফেলুদা হেসে বলল এতে মনের করার কিছুই নেই। আমাদের কলকাতার অবস্থাও এর চেয়ে ভাল নয়।

ইঞ্জিনের মৃদু গম্ভীর শব্দ তুলে গাড়ি এগিয়ে চলছে। এখনও তেমন জ্যামে পরি নি। কাকলী মোড় আসতেই শুরু হল তীব্র জ্যাম। গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। নড়াচড়ার নাম গন্ধ নাই। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে No vat, No vat স্লোগান। ফেলুদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রানার দিকে তাকাতেই রানা বলল আমাদের দেশের অথর্ব সরকার শিক্ষার উপরও ভ্যাট বসিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব ধরনের ফি এর উপর ৭.৫০% ভ্যাট আরোপ করেছে। শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই এই অন্যায্য ভ্যাটের বিরুদ্ধে মানব বন্ধন, স্মারকলিপি দিয়ে আসছে। তাতে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে নি। আমাদের দেশে ভাংচুর ছাড়া কিছুই আদায় করা যায় না। তাই বাধ্য হয়েই ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। এর ফলে কার্যত আমাদের রাজধানী অচল হয়ে পরেছে।

 

একটু পর রানা হেটে গেল আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে। ও সেখানে গিয়ে কি বলল জানি না, তবে কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীরাই আমাদের গাড়ি যাওয়ার জন্য পথ করে দিতে লাগল। আন্দোলন-স্থল ত্যাগ করার সময় ছাত্র-ছাত্রীরা জোরে জোরে “No Vat on Education” বলে স্লোগান দিচ্ছিল। রানা গাড়ির গ্লাস উঠিয়ে হাত নেড়ে তাদেরকে উৎসাহ দিচ্ছিল। অনেক ঝক্কি ঝামেলার পর মনে হল জ্যাম পয়েন্ট শেষ। ফাকা রাস্তা পেয়েই রানা স্পিডোমিটারের কাটায় তুলল ১৩০। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রকাণ্ড উঁচু একটা ব্রিজে উঠলাম। রানা বলল এই ব্রিজের নাম মেঘনা ব্রিজ। এ নদী এসেছে আপনাদের ভারত থেকেই। রাতের বেলায় যখন নদীতে নৌকা করে ঘুরবেন তখন মনে হবে সিডনীতে আছেন। দুই ধারে সারি সারি লাইট। সেগুলির আলো পানিতে প্রতিফলিত হয়ে ঢেউয়ের সাথে দোল খেতে থাকে। অপূর্ব মনোরম দৃশ্য। মিঃ জটায়ু আপনি তো সাহিত্যিক। সাহিত্যিকদের শব্দের গাঁথুনি যোগাতে এমন পরিবেশের বিকল্প নেই। শুনে জটায়ু বললেন মন্দ বলেন নি মশাই। রাতের বেলায় একবার নৌকা দিয়ে ঘুরতে পারলে ভালই হত। জ্যোৎস্না রাতে মাঝ নদীতে নৌকার পাটাতনে শুয়ে ভাবতাম আমার গল্পের হিরো প্রখর রুদ্রকে এমন নদীতে নৌকার মাঝি বানায়া দেওয়া যায় কিনা।

 

জটায়ুর কথা শুনে আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। বললাম আপনার হিরো প্রখর রুদ্র স্পাই। স্পাইদের নৌকার মাঝি হয়ে জ্যোৎস্না স্নান করা মানায় না। স্পাইরা ছুটে বেড়াবে রকেটের গতিতে। রানা বলল আরেকটু সামনে গেলে চোখে পরবে গোমতী সেতু। ঐটা আমাদের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু। মেঘনা সেতু, গোমতী সেতুর কাজ একই সময়ে করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত গাড়ির চাপে সেতুগুলোকে কয়েকবার মেরামত করতে হয়। এরপর মিনিট দশেক চলতেই আমরা উঠলাম গোমতী সেতুর উপর। সেতুটি দুটি নদীর উপর অবস্থিত। পাশাপাশি বয়ে গেছে গোমতী নদী ও মেঘনা নদীর একটি শাখা। নদীতে তেমন স্রোত নেই। মনে হচ্ছে একবারে মরা নদী। সাই সাই করে গাড়ি এগিয়ে চলছে। আমরা কুমিল্লা সেনানিবাসে গিয়ে পৌঁছলাম রাত ৬ টায়।

 

*********************

 

 

আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেনানিবাসের ভিতরেই। যে আয়োজন করা হয়েছে তাতে কোন অংশেই ফাইভ স্টার হোটেলের চেয়ে কম না। পাশাপাশি ৩টা রুম। বেশ বড় সড় রুমই। যাতে ডাবল বেডের খাট বিছানো। খাটের উপর আরামদায়ক তোষক বিছানো। উপরে বেশ দামি চাদর। মেঝেতে গালিচা বিছানো। সাজ সজ্জা দেখেই বুঝা যায় এই বাংলোতে শুধু বিদেশী কোন গেস্টই থাকে। প্রতিটি রুমেই এটাচড বাথরুম রয়েছে। জানালার পর্দাগুলো বেশ মনোমুগ্ধকর। তিন দিকের দেওয়ালে ফুল গাছ। মাথার উপর রুম হিটার। তাতে শীত টের পাওয়া যায় না। তবে বাইরে গেলেই হার কাপিয়ে দেয়। আমাদের দেখ ভাল করার জন্য ২ জন সেনা সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে। ফেলুদা বলল রানা অতিথেয়তার ঘাটতি রাখে নি। পরিবেশটাও চমৎকার। এমন সময় রানা আমাদের রুমে প্রবেশ করল। সাথে ৩ জন লোক। চেহারা দেখেই বুঝা যায় এরা অফিসার গোছের কেউ হবেন। রানা পরিচয় করিয়ে দিল উনি হচ্ছেন আমাদের সেনানিবাস প্রধান মেজর জেনারেল খায়রুল ইসলাম। উনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউসুফ আলী। আর উনি হচ্ছেন মেজর খালিদ মোশাররফ।

 

এরপর ফেলুদাকে দেখিয়ে মেজর জেনারেল খায়রুলের দিকে তাকিয়ে বলল উনিই স্বনামধন্য গোয়েন্দা ও আমার বন্ধু প্রদোষ মিত্র। ওর কথাই আপনাকে বলেছিলাম। ফেলুদা হাত বাড়িয়ে মেজর জেনারেল খায়রুলের সাথে হ্যান্ডশেক করল। আমাকে দেখিয়ে বলল এ হচ্ছে আমার চাচাতো ভাই শ্রীমান তপেশ। অত্যন্ত বুদ্ধিমান বালক। লালমোহনবাবুর দিকে দেখিয়ে বলল ইনি হচ্ছেন রহস্য রোমাঞ্চ ঐপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু। এরপর আমরা সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে দুভাগ হয়ে সোফায় বসলাম। এক পাশে আমি, ফেলুদা, জটায়ু আরেক পাশে রানা, মেজর জেনারেল খায়রুল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউসুফ, ও মেজর খালিদ। মেজর জেনারেল খায়রুল ফেলুদার মত এত লম্বা না হলেও ৬ ফুটের কাছাকাছি হবেন। অন্য দুজনের উচ্চতাও ৫ ফুট ৯/১০ ইঞ্চি ছাড়াবে। এত লম্বা মানুষের ভিড়ে ৫ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার জটায়ুকে বামনই মনে হচ্ছে।

মেজর জেনারেল খায়রুল বলল মিস্টার মিটার আপনার নাম ডাকের কথা অনেক শুনেছিলাম। কিন্তু স্বচক্ষে যে আপনাকে দেখব সেটা কোনদিনই ভাবি নি। আশা করি আপনার আগমনটা বৃথা যাবে না। আমাদের কুমিল্লা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিবেষ্টিত।

ফেলুদা বলল আপনাদের এখানে আসতে পেরে আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। আপনাদের অতিথেয়তা আমাকে বিমোহিত করেছে। যদিও আমি সেটার যোগ্য ছিলাম না। এ সবই সম্ভব হয়েছে রানার কল্যাণে। রানা না থাকলে এমন একটি সুন্দর জায়গার কথা কোনদিন জানতেই পারতাম না।

মেজর জেনারেল খায়রুল বলল আজকাল প্রাইভেট ডিটেকটিভদের জীবন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। সব রাষ্ট্রেই অনেক সরকারি গোয়েন্দা রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। গোয়েন্দারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। দলীয় চাপের কাছে হার মানতে হয়। এতে তারা সঠিকভাবে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য জানাতে পারে না। ফলে দেশে অহরহ অপরাধ সংঘটিত হয়। আপনাদের মত প্রাইভেট গোয়েন্দারা নিজে তদন্ত করে কিছু বের করবেন আর সেটা যদি ক্ষমতাসীন কোন নেতার বিরুদ্ধে যায় তাইলে সারছে। আপনাকে আর দেশে থাকতে হবে না। আমাদের রানা সেনাবাহিনীর কর্নেল হলেও ও ব্যক্তিগতভাবে স্পাইং করে। আমি অনেক বলেছি সেনাবাহিনীর ডিজিএফে যোগ দিতে। কিন্তু কে শুনে কার কথা।

রানা বলল স্যার ও এখানে কোন তদন্ত করতে আসে নি। আমার আমন্ত্রণে শুধু বেড়াতে এসেছে। ক্ষমতাসীন কারও বিরুদ্ধে কোন রিপোর্ট দিচ্ছে না।

মেজর জেনারেল খায়রুল বলল আপনি আমাদের মেহমান। যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াবেন। চারদিকে আমাদের টইল সৈন্য রয়েছে। কোন বিপদের ভয় নেই।

একটু পর একজন সেনা সদস্য ট্রে হাতে চা আর বিস্কুট নিয়ে এলো। দূর থেকেই চায়ের মোলায়েম সুগন্ধ বেরুচ্ছে। টি টেবিলে চা রাখার পর আমরা সবাই চা নিলাম। জটায়ু চায়ে চুমুক দিয়েই হা হু করতে লাগল। কড়া গরম চা। সেটা জটায়ু লক্ষ করেন নি। তাই একটু বেশিই মুখে দিয়ে ফেলেছেন। অনুমান করলাম জটায়ুর জিভ পুরে গেছে। জটায়ু গরম চায়ের ধকল সামলে নিয়ে বললেন আপনাদের চা তো অতি সুস্বাদু। টেস্ট অসাধারণ।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউসুফ বলল এই চা আমাদের দেশেই উৎপন্ন হয়। সিলেট ও মৌলভীবাজারে গেলে প্রচুর চা বাগান দেখতে পাবেন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে। খাটি চা পাতা খুব কমই পাওয়া যায়। বাগান থেকে বের হওয়ার পরই এগুলাতে ভেজাল মিশানো হয়। অবশ্য আমাদের এখানে সেনানিবাস বলে কেউ সাহস করে না ভেজাল কিছু দিতে।

মেজর খালেদ বলল মিস্টার মিত্তির আমাদের চা বিদেশেও রপ্তানি হয়। চা রপ্তানি করে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

জটায়ু চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল কি বল ভাই তপেশ, কলকাতায় ফিরার সময় কিছু চা পাতা নিয়া যাব সোজা সিলেটের চা বাগান থেকে। গল্প লেখার ফাকে ফাকে এমন চায়ে কয়েক চুমুক দিতে পারলে মাথাটা আরও খুলে যাবে। আর মাথা যত খুলবে লেখা তত ভাল হবে। পাঠকরাও তত বেশি গিলবে। পাঠকরা যত বেশি গিলবে আমার পকেটের স্বাস্থ্যও তত ভাল হবে।

আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। বললাম চা পাতা সরাসরি চায়ের বাগান থেকে কেনা যায় না। এর জন্য বিড করতে হয়। বিড করতে হলে আপনার লাগবে লাইসেন্স। এসব আছে কি মিস্টার জটায়ু?

জটায়ুর হতাশ মুখ দেখেই কিনা মাসুদ রানা বলল আমাদের এখানে অনেক চা পাতা রিজার্ভ আছে। আপনি নিতে চাইলে যাওয়ার সময় দিয়ে দেওয়া যাবে।

একটু পর খায়রুল বলল মিস্টার মিত্তির আপনার সাথে পরিচিত হতে পেরে ভাল লাগল। এখন তাইলে উঠি। যে কোন প্রয়োজনে আমাকে খবর দিবেন। আমি এমনিতেই ব্যস্ত থাকি। তারপরও চেষ্টা করব আপনার এখানে এসে জমিয়ে আড্ডা দিতে। গুড নাইট জানিয়ে চলে গেলেন ৩ অফিসার। আমাদের সাথে রয়ে গেলেন মাসুদ রানা।

রানা বলল আপনাদেরকে সব কিছু ঘুরে দেখাতে নিয়ে যাবেন আমার এক টুরিস্ট বন্ধু বিল্লাহ মামুন। মামুন দেশের নামকরা ট্র্যাভেলর। দেশের এমন কোন পর্যটন স্পট বাদ নেই যেখানে ওর পদধূলি পরে নি। আমাদের কুমিল্লার পুরো পিকনিক স্পট অনেক বড়। পুরোটা ঘুরে দেখতে আপনাদের কয়েকদিন লাগবে। সেনানিবাস ছোট ছোট অনেক টিলার উপর করা হয়েছে।

ফেলুদা বলল এখানে দেখার মত কি কি আছে?

রানা বলল অনেক কিছুই আছে। লালমাই পাহাড়, শালবন বিহার, শালবন, ইটাখোলা মুড়া, ওয়ার সিমেট্রি, বার্ড, কুমিল্লা শহরে আছে ধর্ম সাগর, গোমতী নদী। আমরা ৪ জন মিলে গল্প গুজব করছিলাম। এ সময় একজন সেনা সদস্য এসে খবর দিল ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা ৪ জন চললাম ডিনার রুমে। খাবারের মেনুতে আছে কয়েক প্রকার কাবাব, খাসির কাচ্ছি বিরিয়ানি, শাহী পোলাউ, দেশি মুরগীর রোস্ট, ও সালাদ। লালমোহনবাবু মুরগীর ঠ্যাং চিবাতে চিবাতে বলল বাবুর্চির রান্নার তারিফ করতে হয়। দারুণ টেস্ট।

ফেলুদা বলল যে সে লোকেরা সেনানিবাসের রান্নার দায়িত্ব পায় না। আপনি ভুলে যাচ্ছেন এটা একটা সেনানিবাস।

জটায়ু ঠোট বাকিয়ে বলল আরে মশাই এত ভুল ধরতে যাবেন না। একটু প্রশংসা করতে দেন। রিয়েলি হি কুকেড ওয়েল।

জটায়ুর কথা শুনে আমি কোন মতে হাসি চেপে রাখলাম। শুধুরে দিলাম এটা কুকেড না কুকড। খাওয়া শেষ করে আমরা চলে এলাম আমাদের রুমে। রানা আমাদের কাছ থেকে আজকের মত বিদায় নিয়ে চলে গেল। রুম লক করে আমরা বসলাম ফেলুদার খাটে। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। রুম হিটার থাকায় সেটা আমরা টের পাচ্ছি না।

জটায়ু ফেলুদাকে বলল অনেক দিন বাড়ির বাইরে ঘুমাই নি। এই ক্যান্টেন্টম্যান্ট তো জঙ্গলের ভিতরেই। রাত বিরাতে বাঘ ভাল্লুক এসে হামলা করবে না তো?

ফেলুদা হেসে বলল বাংলাদেশে সুন্দরবন ছাড়া আর কোথায়ও বাঘ নাই। থেকে থাকলেও এই সেনানিবাসে এসে হামলা করার দুঃসাহস ওরা করবে না। চারদিকে টইল সেনা আছে। আর শব্দটা ক্যান্টেন্টম্যান্ট না ক্যান্টনম্যান্ট।

জটায়ু ছে ছে করে বলল এত জটিল কিসিমের শব্দ মুখে দিয়ে আসতে চায় না মশাই।

ফেলুদা বলল জানিস তোপসে এই কুমিল্লা আগে ত্রিপুরা নামে পরিচিত ছিল। পরে ত্রিপুরা থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই কুমিল্লা সেনানিবাস বাংলাদেশের প্রথম সেনানিবাস। পূর্বে এখানে বৃটিশদের সেনা ঘাটি ছিল। কোথায়ও গেলে সে স্থান সম্পর্কে পড়াশুনা করা ফেলুদার পুরানো অভ্যাস সেটা আমার জানাই ছিল। বুঝলাম ও এসব জেনেছে গুগলে সার্চ করে। রাত ১১ টায় জটায়ু চলে গেলেন তার রুমে। আমি শুতে গেলাম আমার রুমে। ফেলুদা তখন ল্যাপটপে ইন্টারনেট নিয়ে কাজ করছিল।

 

আমাদের ঘুম ভাঙল সকাল ৭ টায়। ব্রেক ফাস্টের পর রানা এলেন আমাদের কাছে। আমরা বেরোব নটায়। ট্র্যাভেলর বিল্লাহ মামুন আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করবেন। সাথে রানাও থাকবে। মামুন কুমিল্লা শহরেই থাকেন। আমাদের কাছে এসে পৌঁছলেন ৮:৩০ মিনিটে। মাসুদ রানা আমাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। বিল্লাহ মামুন লোকটাকে আমার বেশ ভাল লেগেছে। কথা বার্তা বলেন অনেক স্মার্টলি। মুখে লম্বা দাড়ি ও সুন্দর করে ছাটা গোফ। মোটাও না  চিকনও না এমন স্বাস্থ্যের অধিকারী। ঠিক হল আমরা প্রথমে লালমাই পাহাড় ঘুরে দেখব। বেলা নটায় আমরা বেরিয়ে পরলাম সেনা বাহিনীর গাড়িতে করে। অত্যাধুনিক মার্সিডিজ গাড়ি। এখন বিলাসিতার প্রতীক হয়ে গেছে মার্সিডিজ গাড়ি।  কুয়াশার কারনে সূর্য উঠে নি। তাই শীতের কাপড় সাথে নিয়েই বের হতে হল। গাছে গাছে জমে আছে ঘন কুয়াশা। পথ বেশি দূর দেখা যায় না। কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে প্রায় ৫ মাইল দক্ষিণে লালমাই পাহাড়। আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমরা পাহাড়ের পাদদেশে গিয়ে নামলাম।

**********************************

 

মামুন আমাদেরকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব দেখাতে লাগলেন। লালমাই পাহাড়ের মাটি লাল। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ইটের স্তূপ। পাহাড় বেশি উঁচু নয়। উপরে প্রায় সমতল। মামুন লালমাই পাহাড়ের ইতিহাস বলতে লাগলেন। কুমিল্লার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক লালমাই পাহাড়। কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ ও বরুড়া উপজেলা জুড়ে এই লালমাই পাহাড়টি অবস্থিত। এটি উত্তর-দক্ষিণে ১১ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২ মাইল চওড়া। এ পাহাড়ের মাটি লাল হওয়ায় এর নাম লালমাই। এ পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫০ ফুট। এ ছাড়া কথিত আছে, রাম-রাবণের যুদ্ধে রামের ছোট ভাই লক্ষণ গুরুতর আহত হলে বৈদ্যের নির্দেশ অনুযায়ী বৈশল্যকরণী পাতার রস ক্ষতস্থানে লাগালে লক্ষণ ভালো হয়ে যাবে বলা হয়। কিন্তু বেচারা হনুমান গাছ চিনতে না পেরে হিমালয় পর্বত পুরোটা তুলে হাতে করে নিয়ে আসে। চিকিৎসার পর আবার পর্বতটা যথাস্থানে নিয়ে যেতে রওয়ানা দেন হনুমান। কিন্তু পথে পর্বতের কিছু অংশ ভেঙ্গে কুমিল্লা সংলগ্ন লমলম সাগরে পড়ে যায়। আর তখন থেকেই এ স্থানের নাম রাখা হয় লালমাই। এছাড়া শোনা যায় এক রাজার নাকি দুই মেয়ে ছিল। একজনের নাম ছিল লালমতি অন্যজনের নাম ময়নামতি। তাদের নামানুসারেই নাকি এই লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়ের নামকরণ করা হয়েছে।

১৯৮৯ সালের এপ্রিলে এবং ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে লালমাই পর্বতমালায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়। এই অনুসন্ধানে এখানে ১১টি প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলি হচ্ছে- লালমাই-১, লালমাই-২, লিলা মুড়া ও টক্কা মড়া, মহরম আলীর বাড়ি, টিপরা মুড়া, মাঁদার মুড়া, মাইধর মুড়া, মেম্বারের খিল, মেহের কুলের মুরা, টক্কা মুড়া-২ ও সরদারের পাহাড়। এই প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত প্রত্নবস্ত্তগুলি ফসিল কাঠের তৈরি। এগুলি হচ্ছে- কাটারি (৩টি), হাত-কুঠার (৬টি), মাংস কাটার ভারি ছুরি (৪টি), কাঠ চাঁছার যন্ত্র (১২টি), বাটালি (১টি), ছুরি (২টি), ছুরির ফলা (৪৬টি), চাঁছনি (৯৮টি), সূচ্যগ্র যন্ত্র (৫০টি), ছিদ্র করার যন্ত্র (৯টি), খোদাই করার যন্ত্র (৪টি), ব্যবহৃত পাতলা কাঠের টুকরা (১২৪টি), কাঠের পাতলা টুকরা (৩৩টি), পাতলা ফালি (৪৩টি)। উপরের প্রত্নবস্ত্তর তালিকা থেকে ধারণা করা যায় যে, এখানে নবোপলীয় যুগের একটি কারখানা ছিল। লালমাই-১ প্রত্নস্থলের ঢালে ১.৫১ মিটার জায়গা জুড়ে ১৯৯১ সালে একটি ছোট উৎখনন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উৎখননের ফলে ফসিল-কাঠের প্রত্নবস্ত্তর পাশাপাশি কিছু মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরাও পাওয়া যায়। প্রত্নস্থলে নবোপলীয় সংস্কৃতির প্রমাণবাহী কিছু মৃৎপাত্র ধ্বংস-প্রায় অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং এগুলিতে কোন নকশা বা ডিজাইন নেই।

আমরা ঘুর ঘুরে একে একে সবগুলো মুড়া দেখলাম। সবগুলা মুড়াই দেখতে বেশ দৃষ্টি নন্দন। ফেলুদা ডিএসলআর দিয়ে অনেকগুলো ছবি তুলেছে। হেটে হেটে দেখলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছিল। সারাদিন প্রায় ১৫ কিলোমিটারের মত এলাকা ঘুরেছি। লাঞ্চ সারা হয়েছে একটি মুড়ায় বসে। সেনানিবাস থেকে এক সেনা সদস্য আমাদের জন্য বিরানি নিয়ে এসেছেন। খোলা পরিবেশে খাওয়াটা বেশ উপভোগ করেছিলাম। ফেলুদা বলেছিল এমন খোলামেলা পরিবেশে খেলে দরিদ্রাতে উপলব্ধি করা যায়। কলকাতা কিংবা বাংলাদেশে যেখানেই তাকাবি না কেন দেখবি যাদের মাথা গোজার জায়গা নেই তাদেরকে এভাবেই খোলা রাস্তায় আহার করতে হয়। লালমোহনবাবু পাহাড় দেখে বলেছিলেন বাহ। এর জুড়ি মেলা ভার। আর কিছুক্ষণ পর পর কাকর কুড়িয়ে গাছের ডালে বসে থাকা পাখিকে ঢিল মারছিলেন। রানা বলল এভাবে ঢিল মারবেন না। ২/১টা মারা গেলে পাখি হত্যার অপরাধে আপনার বিরুদ্ধে মামলাও হয়ে যেতে পারে।

আমরা যখন লালমাই পাহাড় দেখে বাংলোতে ফিরছিলাম তখন বেলা প্রায় পরে গেছে। শীতকাল বলে এমনিতেই দিনের দৈর্ঘ্য অনেক কম। তার উপর ঘন কুয়াশার কারনে ৩টার পর থেকেই সূর্যের দেখা মিলে না। গাড়িতে রানা বলল আজ কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আপনাদেরকে রাতের বেলায় ময়নামতি মিউজিয়ামে নিয়ে যাব। দিনের বেলায় টুরিস্ট এর ভিড় থাকে বিধায় আপনাদেরকে ঐখানে নিয়ে যাই নি। বিকেলে বাইরের একটা রেস্টুরেন্টে স্নেক্স সেরে আমরা বাংলোতে ফিরলাম। সারাদিন ঘুরাঘুরি করায় একটু ক্লান্তি লাগছিল। একটু পরেই চা এলো। আবার সেই মোলায়েম গন্ধ। চা পান করে শরীরটাকে একটু সতেজ করে নিলাম। ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বের করে মুভি দেখতে বসলাম। খানিক পর জটায়ু হাঁক ছাড়লেন। ভাই তপেশ দেখে যাও তো আমার মোবাইল দিয়া ইন্টারনেট চলে না কেন। কি সব ব্রাউজার না ট্রাউজার এসব আমার মাথায় ঢুকে না। জটায়ুর সামস্যাং এস ৬ হাতে নিয়ে দেখলাম উনি ডাটা কানেকশন অন করেন নি। ডাটা কানেকশন অন করে দিলাম। ফেলুদা কয়েকটা একশন মুভি ডাউনলোড দিল। বলল রানা আসলেই আমরা ময়নামতি মিউজিয়ামে যাব। এ ফাকে এগুলো ডাউনলোড হতে থাকবে। আমরা ফিরে আসতে আসতে ডাউনলোড শেষ হয়ে যাবে। পরে দেখা যাবে।

এ সময় মাসুদ রানার আগমন। রানা বলল আপনারা এখনই তৈরি হয়ে নিন। ময়নামতি মিউজিয়ামে অনেক মূল্যবান জিনিষপত্র রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে জাদুঘরে। আমাদের তৈরি হতে লাগল ৫ মিনিট। তারপর বেরিয়ে গেলাম রানার সাথে জাদুঘর দেখার উদ্দেশ্যে। আমাদের বাংলো থেকে জাদুঘরের দূরত্ব সামান্য। তাই হেটেই রওনা দিলাম। লালমোহনবাবু পুল ওভার চাপিয়ে নিয়েছেন। তাতে শীত উনাকে স্পর্শ করতে পারছে না। রানা হাটতে হাটতে বলল ময়নামতি মিউজিয়াম দেশের একমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মিউজিয়াম। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক নিদর্শন এখানে রয়েছে। কিন্তু দিন দিন এসব নিদর্শন চুরি হয়ে যাচ্ছে। হাটতে হাটতে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম যাদুঘরের গেটে। জাদুঘরের সামনে সুসজ্জিত ফুলের বাগান। দেখে মনে হচ্ছে যোদ্ধাদের কবর রয়েছে। গেটে সশস্ত্র প্রহরী রয়েছে। প্রহরী আমাদেরকে দেখেই সালাম দিল। সালামের জবাব দিল শুধু রানা। প্রহরীর নাম নাজমুল সেটা বুঝলাম যখন রানা প্রহরীকে লক্ষ করে বলল নাজমুল মিউজিয়াম কিউরেটর এসেছে?

প্রহরী বলল ওরা সবাই এসেছে। আমরা যাদুঘরের ভিতরে ঢুকলাম। মিউজিয়াম কিউরেটর আদনান আমাদের জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন। পরিচয় পর্ব শেষ হলে আমরা সবাই মিলে জাদুঘরে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মেঝে ও আলমারিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যোদ্ধাদের বিভিন্ন অস্ত্র। মরিচা পরে নষ্ট হচ্ছে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। ফেলুদা বলল বাঙালি আসলেই সাহসী জাতি। যেসব অস্ত্র দিয়ে আপনারা যুদ্ধ করেছেন সেসব অস্ত্র এখন কেউ দেখলে নির্ঘাত হাসাহাসি করত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের কিছু নিদর্শন রয়েছে জাদু ঘরের ভিতর। আমরা একটি প্রশস্ত কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করলাম। কিউরেটর আদনান বলল এই কক্ষটি শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত বৃটিশ সেনাদের অস্ত্র সস্ত্রের জন্যই রাখা হয়েছে। আমরা কিউরেটরের সাথে কথা বলছিলাম। এমন সময় রানা আলমারি থেকে একটা বুলেট বের করে আনল।

রানা বলল আজ আপনাদের সবাইকে একত্রিত করেছি এই মহা মূল্যবান জিনিষটি দেখাতে। এটি সাধারণ কোন বুলেট নয়। ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জের খোদাই করা ছবিযুক্ত। সম্ভবত রাজকীয় সেনারা এই বুলেট ব্যবহার করত। এই বুলেটের সন্ধান পেলে নিলামে এর দাম ১০ লাখ পাউন্ড ছাড়িয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছুই নাই।

রানার কথা শুনে সবাই মুখ দেখাদেখি করল। আদনান অবাক হয়ে বলল এমন একটা মূল্যবান রত্ন আমাদের এখানে আছে সেটার কথাই এতদিন জানতাম না।

লালমোহনবাবু বলল একটা বুলেটের এত ভ্যা ভ্যা ভ্যালু?

ফেলুদা বলল আক্ষরিক অর্থে হিসেব করতে গেলে কয়েক হাজার টাকা খরচ করলেই এমন বুলেট পাওয়া যায়। কিন্তু বুলেটটা ঐতিহাসিক বলেই এর এত দাম। এর সাথে জড়িয়ে আছে বৃটিশ রাজ পরিবারের নাম।

রানা বলল আদনান সাহেব বুঝতেই পারছেন এখানে এমন একটা মূল্যবান জিনিষ আছে সেটা জানলে চোর ডাকাতদের লোলুপ দৃষ্টি পরবে জাদুঘরের উপর। তাই জাদুঘরের নিরাপত্তা আরও বাড়াতে হবে। জাদুঘর দর্শন করে আমরা বাংলোতে ফিরে আসলাম। রানা নিজেই জেনারেল খায়রুলকে খবর দিল। খবর পেয়ে ১০ মিনিট পরেই আসলেন জেনারেল খায়রুল। এসেই ফেলুদাকে বলল আপনাদের আজকের ঘুরাঘুরি কেমন হয়েছে মিস্টার মিত্তির?

ফেলুদা হেসে বলল জীবনে অনেক পাহাড় দেখেছি। কিন্তু এত নিচু আর লাল মাটির পাহাড় কোথায়ও দেখি নি। বেশ চমৎকার লুকিং।

রানা বলল স্যার আপনি সন্ধ্যায় ব্যস্ত ছিলেন বলে খবর দেই নি। আমাদের ময়নামতি জাদুঘরে একটি মূল্যবান বুলেট রয়েছে। যার মূল্য কয়েক শ কোটি টাকা ছাড়াবে। অনেক দিন থেকেই বুলেটটির কথা আমি জানতাম। কিন্তু চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে কাউকে বলি নি। আজ আমি আমার বন্ধু প্রদোষ মিত্রের সম্মানে সেটি বের করলাম।

রানার কথা শুনে জেনারেল খায়রুল প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। বল কি রানা এমন একটা মূল্যবান সম্পদ আমাদের এখানে আছে সেটা আমি জানতে পারি নি। আমি সংবাদ সম্মেলন করে পত্রিকায় সব জানিয়ে দিচ্ছি। তাতে আমাদের সম্মান আরও বাড়বে। ৩০ মিনিট পর সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন জেনারেল খায়রুল। খবর পেয়ে বিভিন্ন পত্রিকা, অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকরা ছুটে এলো। খায়রুলের নির্দেশে বুলেটটি এখানে আনা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলন শেষে আবার জাদুঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

***************************************************

 

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা হাতে নিয়েই দেখলাম প্রধান হেডিং “ময়নামতি জাদুঘরে দ্বিতীয় বিশ যুদ্ধের সময়ের বুলেটের সন্ধানঃ দাম ছাড়াতে পারে কয়েক শ কোটি টাকা”। যদিও প্রিন্টিং পত্রিকা পড়ার অভ্যাস অনেক আগেই ছেড়েছি। অনলাইনে বিনে পয়সায় বিশ্বের সব পত্রিকা পড়া যায়।  তবে সেটা আসল কারন নয়। পাতা ঘাটা, কলাম খুজে বের করা, হাতে ধরে রাখা এসব আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। তাই আমি অনলাইনেই সব কিছু পড়তে সাচ্ছন্দবোধ করি। অবশ্য জটায়ু এখনও প্রিন্টিং পত্রিকা পড়েন। উনি ঠিক মত ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না। হেডিংটা ফেলুদাকে দেখালাম। তাতে ফেলুদা বলল খ্যাতির লোভ কম লোকই সামলাতে পারে। এই রিপোর্টের ফলে বুলেট টা নিরাপদে রাখা কঠিন হবে। দেখবি হয়ত আজকালের মধ্যেই চুরি হয়ে যাবে। আমি ল্যাপটপ খুলে বাংলাদেশের প্রধান পত্রিকাগুলোর হেডিং দেখাতে লাগলাম। প্রায় সব পত্রিকায় এ খবরটাকে হেডিং করেছে। ফেলুদা বলল এই রিপোর্টের ফলে পত্রিকাগুলোর কাটতি বেড়ে যাবে। এমন চাঙ্গা খবর পেলে পত্রিকা ওয়ালাদের বেশ কয়েকদিন চলে যায়। দেখবি আরও ৪/৫ দিন এটা নিয়ে রিপোর্ট হতেই থাকবে। খানিক পর আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল একজন সেনা সদস্য। আজ আমরা ওয়ার সিমেট্রি, শালবন বিহার, শালবন ও ইটাখোলা মুড়া দেখব। সকালের নাস্তা খেয়ে আমরা বেরিয়ে গেলাম বেলা ৯টা নাগাদ। যথারীতি মার্সিডিজে করে বেরিয়েছি। প্রথমে যাব ওয়ার সিমেট্রি দেখতে। ঢাকা-কুমিল্লা মহাসড়কের উত্তর পার্শে ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পশ্চিম পার্শে অবস্থিত এ ওয়ার সিমেট্রি।

 

ক্যান্টনম্যান্ট থেকে ওয়ার সিমেট্রি পায়ে হাটা দূরত্ব। গাড়িতে করে যেতে লাগল ৫ মিনিট। গাইড মামুন বলল এখানে সব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত যুদ্ধাদের সমাধি। যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে তাদেরকে হেলিকপ্টারে করে এখানে নিয়ে আসা হয়। কাউকে আহত অবস্থায় এখানে নিয়ে আসা হয়। এরপর খানিক চিকিৎসার পর মারা যায়। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ও ময়নামতি সাহেবের বাজারের পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে সাড়ে চার একর পাহাড়ি ভূমি জুড়ে বাংলাদেশে অবস্থিত এ ওয়ার সিমেট্রি। এ দেশের অপর ওয়ার সিমেট্রি সমাধি রয়েছে চট্টগ্রাম শহরের বাদশা মিয়া চৌধুরী রোডে। যাতে ৭শ’ ৫৫ জন সৈনিকের সমাধি আছে। কুমিল্লা ওয়ার সিমেট্রির প্রথম ধাপে ইউরোপিয়ানদের কবর ও উপরের ধাপে এ উপ-মহাদেশের যোদ্ধাদের কবর রয়েছে। সমাধিগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। প্রত্যেকটি সমাধিতে লেখা আছে নিহত সৈনিকের নাম, বয়স, পদবি নিহত হওয়ার তারিখ এবং ঠিকানা।
সমাধিক্ষেত্র তৈরির আগে সেখানে ছিল বৌদ্ধ বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দির। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে শ্বেত পাথরের একটি ক্রশ। বর্গাকার এ সমাধি ক্ষেত্রের প্রত্যেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় আড়াইশ ফুট। মোট আয়তন সাড়ে ৪ একর। সমাধিক্ষেত্র চারদিক বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। পুরো সমাধিক্ষেত্রে রং-বেরংয়ের ফুল গাছ এবং অন্যান্য গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে।গাছগাছালির অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য ঘিরে রেখেছে এ সমাধিক্ষেত্রটি। ফুলের সৌরভ, গাছের পাতায় বাতাস আর রোদের খেলা, পাখি ডাকে বিমোহিত পরিবেশের এ সমাধি ক্ষেত্রটিতে গেলে মনে অন্যরকম এক অনুভূতির জন্ম দেয়। এ সমাধিক্ষেত্রে সমাধির সংখ্যা ৭শ’ ৩৮টি। ১৯৬২ সালে ১টি সমাধি নিহত সৈনিকের আত্মীয়-স্বজনরা যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। বর্তমানে এ সমাধিক্ষেত্রে সমাধি সংখ্যা ৭শ’ ৩৭টি। এর মধ্যে ১৪ জন শায়িত সৈনিকের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

 

জটায়ু বলল এত জায়গা থাকতে বৃটিশরা কেন তাদের সেনাদের এখানে নিয়ে এলো?

রানা বলল এখানে শায়িত যোদ্ধারা যুদ্ধ করছিল মায়ানামারে। সেখানেই অপারেশন্স চালাতে গিয়ে তারা নিহত হন। তখন কুমিল্লায় বড় হাসপাতাল ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়। মূলত মায়ানমার থেকে কাছাকাছি ঘাটি হওয়ায় তাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়।

আমরা কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলেছি। সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশস্থ পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসাথে ২৩টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই স্থানটি ছিল মূলত ২৩ জন বিমান সৈনিকের একটি গণকবর, যেখানে লেখা রয়েছে:

“These plaques bear the names of twenty three Airmen whose remains lie here in one grave”

মামুন ঠিকই বলেছে। এমন পরিবেশ যে কাউকে বিমোহিত করবে। পুরো ওয়ার সিমেট্রি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ফেলুদা বলল এই যুদ্ধ পুরাই অনর্থক ছিল। ক্ষমতার বাড়াবাড়ি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া আর কিছুই নয়। অথচ সাধারণ মানুষ চায় শান্তি। বর্তমান বিশ্বে যে অবস্থা চলছে তাতে যে কোন সময় তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে। ওয়ার সিমেট্রি দেখা শেষ করে আমরা গেলাম শালবন বিহারে। শালবন বিহার একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। শালবন বিহারটিও দেখতে বেশ চমৎকার। বিহারের চারদিকে বাউন্ডারি দেওয়া। হাটার সড়কের দুপাশেই সারি সারি ফুল গাছ। প্রচুর পর্যটক রয়েছেন।

ফেলুদা বলল এ সব তো বৌদ্ধদের নিদর্শন বলেই মনে হচ্ছে। কত বড় জায়গা জুড়েই না এরা জমিদারি প্রথা গড়ে তুলেছিল।

 

রানা বলল ঠিকই ধরেছেন মিস্টার মিত্তির। এ বিহারটি বৌদ্ধ আমলে গড়া। বিহারটির আশপাশে এক সময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল বলে এ বিহারটির নামকরণ হয়েছিল শালবন বিহার। এর সন্নিহিত গ্রামটির নাম শালবনপুর। এখনো ছোট একটি বন আছে সেখানে। এ বিহারটি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের মতো হলেও আকারে ছোট।ধারণা করা হয় যে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। শালবন বিহারের ছয়টি নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ পর্বের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে তৃতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় ও বিহারটির সার্বিক সংস্কার হয় বলে অনুমান করা হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয় নবম-দশম শতাব্দীতে। আকারে এটি চৌকো। শালবন বিহারের প্রতিটি বাহু ১৬৭.৭ মিটার দীর্ঘ। বিহারের চার দিকের দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু। কক্ষগুলো বিহারের চার দিকের বেষ্টনী দেয়াল পিঠ করে নির্মিত। বিহারে ঢোকা বা বের হওয়ার মাত্র একটাই পথ ছিল।

 

এ পথ বা দরজাটি উত্তর ব্লকের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের মাঝে ১.৫ মিটার চওড়া দেয়াল রয়েছে। বিহার অঙ্গনের ঠিক মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় মন্দির। বিহারে সর্বমোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। কক্ষের সামনে ৮.৫ ফুট চওড়া টানা বারান্দা ও তার শেষ প্রান্তে অনুচ্চ দেয়াল। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গিতে দেবদেবী, তেলের প্রদীপ ইত্যাদি রাখা হতো। এই কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন। সেখানে বিদ্যা, শিক্ষা ও ধর্মচর্চা করতেন। বিহারের বাইরে প্রবেশ দ্বারের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি হলঘর রয়েছে। চার দিকের দেয়াল ও সামনে চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর নির্মিত সে হলঘরটি ভিক্ষুদের খাবার ঘর ছিল বলে ধারণা করা হয়। হলঘরের মাপ ১০ মিটার গুণন ২০ মিটার। হলঘরের চার দিকে ইটের চওড়া রাস্তা রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে।

 

আমি, জটায়ু, রানা, মামুন ও ফেলুদা শালবন বিহার ঘুরে ঘুরে দেখছি। ফেলুদা পটাপট ফটো তুলছে। কখনও কখনও আমরা নিজেরাই ফটোর মডেল হয়ে যাচ্ছি। একটু পর বৌদ্ধ মন্দিরটিতে গিয়ে পৌঁছলাম। ইটগুলো খুলে নেওয়া হয় নি। এমন নির্মাণ শৈলি দেখলে নির্ঘাত আধুনিক আর্কিটেক্টরা হাসাহাসি করবেন। বিহার দেখা শেষ করে আমরা ঢুকলাম শালবনে। বিহারের পশ্চিম পাশেই শালবন। ঠিক বন বলা যায় না। গাছ গাছালি অনেক পাতলা। শাল গাছই বেশি চোখে পরছে। বনে দেখার তেমন কিছুই নেই। কয়েকটা বাঘ, সিংহ, ব্যাঙ, বানরের মূর্তি বসানো হয়েছে। মুর্তিগুলা অবশ্য কংক্রিটের। টুরিস্টের দল সেগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে পটাপট ফটো তুলছে। শালবনের মাঝখান দিয়ে হাটতে হাটতে আমরা বনের পশ্চিম মাথায় চলে এসেছি। বন পেরিয়ে আমরা উত্তর দিক মোড় নিয়ে গিয়ে পৌঁছলাম ইটাখোলা মুড়ায়। এটিও দেখতে অনেকটা শালবন বিহারর মত। তবে এদিকটায় টুরিস্টদের ভিড় নেই বললেই চলে। পুরো মুড়াটা চক্কর দিলাম। ফেলুদা বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে কয়েকটা ফটো তুলল। ইটাখোলা মুড়া ঘুরে আমরা বাংলোতে ফিরে আসলাম।

*****************************

 

আমি ভাবছিলাম কুমিল্লায় ফেলুদা হয়ত কোন রকম তদন্ত করা ছাড়াই ট্যুর শেষ করতে পারবে। ফেলুদা এখানে কোন তদন্ত করতে আসে নি। কিন্তু এর আগে ফেলুদা যত জায়গায় গিয়েছে সবখানেই তদন্তে জড়িয়ে গেছে। মনে হচ্ছে তদন্ত করা ফেলুদার পিছু ছাড়বে না। বাংলোতে ফিরে শুনলাম এক বৃটিশ ধনুকেবর ব্যবসায়ী এসেছিলেন বুলেটটা কিনতে। পত্র পত্রিকা থেকে তিনি খবরটা জেনেছেন। ভদ্রলোকের নাম পিটার। ১২ লাখ পাউন্ড দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মিউজিয়াম কিউরেটর আদনান বিক্রি করতে রাজি হন নি। অবশ্য এসব ঐতিহাসিক জিনিষপত্র বিক্রি করার জন্য নিলামে তুলতে হয়। এর বাইরে বিক্রি করা যায় না। পিটার শেষটায় নাকি রাগ করে চলে যান। যাওয়ার সময় বলে যান এই বুলেট আমার হস্তগত হবেই। সব শুনে ফেলুদা বলল বুলেটটা রক্ষা করাই কঠিন হবে। পত্রিকার কারনে হাজার হাজার মানুষ জানতে পেরেছে মিউজিয়ামে এমন একটা মূল্যবান বুলেট রয়েছে।

 

জটায়ু বলল মশায় যাই বলেন না কেন এত দিন আপনার সাথে বেড়াতে গিয়ে কোন রহস্যে জড়িয়ে গেছি। কিন্তু এইবার এখনও পর্যন্ত কিছুই হল না। মনটা কেমন জানি উসখুস করতেছে। ফেলু মিত্তিরের মাথা অলস পরে থাকবে এটা ভাবা যায় না। আমি বললাম আজকালের ভিতরই একটা কিছু ঘটতে পারে। দেখেন না যে হারে বুলেটের উপর মানুষের লোলুপ দৃষ্টি পরেছে। ফেলুদা বলল রাইফেলের ভিতর থাকা যে বুলেটরে মানুষের এত ভয় সেই বুলেটের উপরই এখন মানুষের এত লোভ পরেছে। সবই টাকার খেলা বুঝলি। ডিনার শেষে জটায়ু চলে গেলেন তার রুমে। আমি ফেইসবুকে কলকাতার বন্ধুদের সাথে চ্যাট করছিলাম। ফেলুদা গতকালের ডাউনলোড করা মুভিগুলো দেখছিল।

 

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটা দুঃসংবাদ পেলাম। ময়নামতি মিউজিয়ামের প্রহরী নাজমুল গুরুতর আহত। বৃটিশদের বুলেট চুরি হয়ে গেছে। নাজমুলকে সেনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খবরটা রানাই সাত সকালে এসে আমাদেরকে দিয়েছে। রানার মুখ গম্ভীর। বলল নাজমুল অনেক বিশ্বস্ত লোক। আগে প্রতিদিনই অনেক জিনিষপত্র চুরি হয়ে যেত। ৬ মাস আগে প্রহরী পরিবর্তন করে নাজমুলকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর আর কিছু চুরি হয় নি। আমরা সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে পরলাম। ফেলুদা বলল চলুন রানা নাজমুলকে একবার দেখে আসা যাক। আমরা ৪ জন রওনা দিলাম হাসপাতালে। নাজমুলের অবস্থা সাংঘাতিক। আইসিইউ তে রাখা হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বাচার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তখনও জ্ঞান আছে। ফেলুদা ঝুঁকে বলল কখন আপনার উপর হামলা করা হয়?

 

নাজমুল ক্ষীণ কণ্ঠে বলল রাত ১০ টার দিকে মুখোশ পরা ২/৩ জন লোক আমাকে পিছন দিয়ে ঝাপটে ধরে। কথা বলতে নাজমুলের কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে কথা বলছে। এরপর আমার থেকে মিউজিয়ামের চাবি কেড়ে নেয়। আমি চিৎকারও করতে পারি নি। ওরা আমার মুখ চেপে ধরেছিল। এরমধ্যে একজন লোক তালা খুলে মিউজিয়ামে ঢুকে যায়। আরেকজন লাই আর বলতে পারল না নাজমুল। থেমে গেল কণ্ঠস্বর। অচেতন হয়ে গেছে নাজমুল। রানা গিয়ে তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডেকে আনল। ডাক্তার এসে নাড়ি ধরে বলল এখনও জীবিত আছে। আপনারা এখান থেকে চলে যান। রুগীকে যত একাকী রাখা যায় ততই তার জন্য ভাল। ডাক্তারের নির্দেশ মেনে আমরা চলে এলাম বাংলোতে। বাসায় এসে ফেলুদা রানাকে বলল আমাকে একবার জেনারেল খায়রুলের কাছে নিয়ে চলুন। উনার সাথে কিছু কথা বলতে চাই। এরপর আমরা চললাম জেনারেল খায়রুলের অফিসের দিকে। খায়রুল সাহেব সবে অফিসে এসেছেন। আমাদের দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন।

 

ফেলুদা জেনারেল খায়রুলকে বলল আমার সামনেই মিউজিয়াম থেকে এমন একটি মহামূল্যবান রত্ন চুরি হয়ে গেল। এর উপর গার্ডের অবস্থা ভাল নয়। যে কোন মুহূর্তে মারা যেতে পারে। আমার চোখের সামনেই এই ঘটনা ঘটল। বুঝতেই পারছেন আমি একজন গোয়েন্দা হয়ে এর একটা সমাধান না দেখে যেতে পারলে মনটা উসখুস করবে। আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি এ ব্যপারে তদন্ত চালিয়ে যাব। শুনে খায়রুল বলল বুলেট চুরির একটা বিহিত হউক সেটা আমিও চাই। পুলিশের উপর আমার আস্থা নেই। এখন পুলিশ চলে রাজনৈতিক প্রভাবে আর টাকার জোরে। যার টাকা বা রাজনৈতিক প্রভাব আছে সে ইচ্ছে মত পুলিশকে ব্যবহার করতে পারে। আপনি তদন্ত করতে চাইলে করতে পারেন। আমাদের তরফ থেকে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করা হবে আপনাকে। একই সাথে তিনি মাসুদ রানাকে তদন্তে নামতে নিষেধ করে দিলেন। কেন নিষেধ করলেন সেটা তিনিই ভাল জানেন।

 

জেনারেল খায়রুলের অফিস থেকে ফিরে আসলাম। তদন্তের প্রয়োজনে ফেলুদাকে আজ এখানে সেখানে যেতে হবে। তাই পূর্ব নির্ধারিত বার্ডে ঘুরতে যাওয়া ক্যানসেল করা হয়েছে। রানাকে আরেক জায়গায় পাঠিয়েছেন জেনারেল খায়রুল। তাই রানা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেল। আমি, জটায়ু, ফেলুদা বাংলো থেকে কাটায় কাটায় ১০ টায় বের হলাম। প্রথমে গেলাম জাদুঘরে। সেখানে গিয়ে দেখি পুলিশ পুরো জাদুঘর গিরে রেখেছে। অপরাধী আবার এসে আলামত নষ্ট করতে পারে তাই এই সতর্কতা। পুলিশ কাউকেই ভিতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। কয়েকজন সেনা সদস্য ওদের নিকট আমাদের পরিচয় দিতেই গেট খুলে দেওয়া হল। ইন্সপেক্টর আমাদের পরিচয় জেনে খুশিই হলেন। গেটে গার্ড নাজমুলের রক্তে পরে আছে। বুঝা যায় এখানেই তার মাথায় কিছু একটা দিয়ে আঘাত করা হয়। ভিতরে ঢুকে ফেলুদা সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। আমাদেরকে নিষেধ করল কোন কিছুতে হাত দিতে। ফেলুদা না বললেও বুঝলাম তাতে আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এ কারনেই ও আমাদেরকে হাত দিতে নিষেধ করেছে। সব কিছুই ঠিক ঠাক মত আছে। শুধু বুলেট টাই নেই। ফেলুদা জাদুঘরে যারা আছে সবাইকে জেরা করল। সবার একই উত্তর তারা গতকাল অফিস ছুটি হতেই বাসায় চলে যায়। নাজমুলের ডিউটি ছিল রাতের বেলায়। রাতে কারা নাজমুলের উপর হামলা করেছে তার কিছুই ওরা জানে না।  কিউরেটর আদনানকে জাদুঘরে পাওয়া যায় নি। সে চলে গেছে পুলিশের সাথে। ফেলুদা বলল আদনানের সাথে কথা বলাটা জরুরী। আদনান কখন আসবে কেউই বলতে পারল না। অগত্যা আমরা বাংলোতে ফিরে এলাম।

 

আমরা বাংলোতে ফিরে আসার পর বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে আদনানই ফেলুদাকে ফোন দিল। আদনান বলল একটু আগে পুলিশের ইনভেস্টিগেশন টিম জাদুঘর পরিদর্শন করে গেছে। আজ ছুটির দিন বলে সব ঝামেলা সামাল দিয়ে এখন বাসায় অবস্থান করছে। কথা বলতে চাইলে আমরা যেন তার বাসায় চলে যাই। ফোন করা শেষ হলে ফেলুদা কাল বিলম্ব না করে আদনানের বাসার দিকে ছুটল। আদনান থাকে সরকারি কোয়ার্টারে। বাসায় ঢুকে আমরা বসলাম বৈঠকখানায়। বিষণ্ণ বদনে বসে আছেন কিউরেটর আদনান।

 

আমরা সোফায় ভাগ হয়ে বসলাম। অপ্যায়ন পর্বে শেষে ফেলুদা বলল আপনাকে বাসায় এসে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত মিস্টার আদনান। এমন একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি হয়ে যাওয়ায় আপনাদের মত আমারও খারাপ লাগছে। আমি একজন গোয়েন্দা। তার উপর আমার চোখের সামনেই ঘটল এমন ঘঠনা। তাই আমিই নিজেই ব্যক্তিগতভাবে এটার তদন্ত করব। আপনার নিশ্চয়ই তাতে আপত্তি নাই?

প্রফুল্ল হয়ে উঠল আদনানের মুখায়ব। বলল এমন একটা দুর্লভ বস্তু চুরি হয়ে গেল। অথচ কালই একজন ১২ লাখ পাউন্ড অফার করেছিল। কিন্তু আমি বিক্রি করতে রাজি হয় নি। আমাকে হুমকি পর্যন্ত দিয়ে গেছে তাকে না দিলে আমাকে হত্যা করা হবে। আপনি তদন্ত করলে আমার আপত্তি তো থাকবেই না বরং খুশিই হব। আমার বিশ্বাস প্রদোষ মিত্রের তদন্তের ফলে চোরের সাথে বুলেটও বেরিয়ে আসবে।

ফেলুদা বলল আপনি কাল জাদুঘর থেকে ফিরেছেন কয়টায়?

আদনান বলল আমার অফিস টাইম সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। সব কিছু গুছিয়ে ফিরতে ফিরতে ৫টা বেজে যায়। প্রতিদিনের মত কালও ফিরেছি ৫ টায়। আসার সময়েও আমি বুলেটটি সযত্নে রেখে এসেছিলাম।

এরপর বাসায় এসে কি কি করেছেন?

আদনান বলল বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যায় গেলাম স্বপ্ন তে বাজার করতে। কয়েকদিন পর পরই স্বপ্নতে যেতে হয়। ঐখান থেকে ফর্মালিনমুক্ত সবজী কেনা যায়। তাই কাচা বাজারটা সেখান থেকেই করি। স্বপ্ন থেকে ফিরে চা স্টলে খানিক সময় আড্ডা মারি। এরপর রাত ৮ টায় বাসায় ফিরে ডিনার সেরে টিভি দেখতে বসি। ঘুমাতে যাই ১০:৩০ মিনিটে। এইটা আমার রোজকার রুটিন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাই।

চুরির ব্যপারে আপনার কাউকে সন্দেহ হয় কি মিস্টার আদনান?

আদনান বলল আমার তো পিটারকে সন্দেহ হচ্ছে। কাল ব্যাটার কথা বার্তা ঠিক ভাল ঠেকে নি। আমাকে হত্যার হুমকী দিতে পারে যে লোক সে চুরিও করতে পারে। আমি থানায় নিরাপত্তা চেয়ে জিডিও করেছি।

ফেলুদা আদনান সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে তার বাসা থেকে বেরিয়ে এলো। আদনানও দেখি আমাদের সাথে বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন। বলল আবার জাদুঘরে ফিরে যাচ্ছে। স্থানীয় এমপি জাদুঘর পরিদর্শনে আসবেন। তাই তাকে সেখানে থাকতে হবে।

আদনানের বাসা থেকে আমরা যখন বাংলোতে ফিরলাম তখন দুপুর গড়িয়েছে। আমরা স্লান সেরে লাঞ্চ করছিলাম। এম সময় ফেলুদার মোবাইল বেজে উঠল। ফোনে কথা বলা শেষ করে ফেলুদা জানাল গার্ড নাজমুল মারা গেছেন। জটায়ু আক্ষেপ করে বললেন এমন হাসি খুশি লোকটা কালই আমাদের সাথে কথা বলেছিলেন। আর আজ তিনি মৃত। আমরা তাড়াতাড়ি লাঞ্চ শেষ করে হাসপাতালে গেলাম।

***************************

 

হাসপাতাল গিয়ে ডাক্তার থেকে জানতে পারলাম যে আমাদের সাথে কথা বলার সময় জ্ঞান হারানোর পর আর জ্ঞান ফিরে নি নাজমুলের। অজ্ঞান অবস্থায় কোমায় চলে যায়। ঐ অবস্থায়ই মৃত্যু হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষণের কারণেই তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে জেনারেল খায়রুল, কিউরেটর আদনান, রানা সহ সেনাবাহিনীর অনেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এসেছেন। পোস্ট মর্টেম করে নাজমুলের লাশ এ্যাম্বুলেন্সে করে তার দেশের বাড়ি নোয়াখালি পাঠানো হবে। তার আগে এখানে জানাজা হবে। কিউরেটর আদনান দেখলাম মাথা চাপড়াচ্ছে। স্তব্ধ হয়ে গেছে রানা। লালমোহনবাবুও কেমন জানি চুপসে গেছেন। আগের মত সেই প্রফুল্ল ভাবটা নেই চেহারায়। বুলেট চুরির সাথে আরেক রহস্য যুক্ত হয়েছে। কে খুনি? খুনি আর চোর কি একই ব্যক্তি? নাকি খুনি আলাদা, চোর আলাদা? এমন অনেক প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেলুদা কি পারবে এই দুই রহস্যের সমাধান করতে? এখানে সম্পূর্ণ অচেনা জায়গা।

 

তার সাথে এখনও পর্যন্ত কোন ক্লু পাওয়া যায় নি যেটা ধরে তদন্ত করা যায়। ফেলুদা একা কিভাবে এসব রহস্যের কুল কিনারা করবে। ফেলুদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার মুখ গম্ভীর। আইসিও তে কেমন একটা পিনপতন নীরবতা। এমন সময় দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করল পুলিশ। পুলিশ থানায় লাশ নিয়ে যাবে পোস্ট মর্টেম করতে। জেনারেল খায়রুল ওসির সাথে ফেলুদার পরিচয় করে দিল। ওসি ফেলুদার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করল। খায়রুল আরও বলল ফেলুদা ব্যক্তিগতভাবে বুলেট চুরি ও খুনের রহস্য নিয়ে তদন্ত করবে। তবে আপনারাও আলাদা করে তদন্ত করতে পারেন। নেমপ্লেট দেখে বুঝলাম ওসির নাম ইকরাম। ভদ্রলোক বয়সের তুলনায় বেশ শক্ত পোক্ত। খায়রুলের কথা শুনে ওসি সাহেব মুখে কিছুটা বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন শখের গোয়েন্দারা আবার অপরাধী ধরবে। ওসি ইকরামের কথায় ফেলুদা কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না।

 

ওসি সাহেব নাজমুলের লাশ থানায় নিয়ে গেলেন। ময়না তদন্ত করে ঘাতকের কোন আলামত সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হবে। খায়রুল বলে দিয়েছেন ময়না তদন্তের রিপোর্ট যেন ফেলুদার হাতেও দেওয়া হয়। বিষণ্ণ মনে আমরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম। রুমে ফিরে ফেলুদা বলল বিকালটা রুমেই কাটাবে। বাহিরের পরিস্থিতি খারাপ। আমাদেরকেও একা একা যেতে বারণ করল। আমি ফেলুদাকে বললাম আচ্ছা নাজমুলের সর্বশেষ কথা লাই এর মানে বুঝেছো?

 

ফেলুদা বলল বুঝতে পারলে তো এতক্ষণ তদন্ত অনেক দূর এগিয়ে যেত। জটায়ু বলল ভদ্রলোক হয়ত লাইয়ার বলতে চেয়েছিলেন। ফেলুদা বলল কিন্তু মিথ্যুকের সাথে একজনকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আঘাত করার সম্পর্ক কি? আর এটা লাইয়ার না লায়ার। লালমোহনবাবু ভেবেছিলেন তিনি ফেলুদার আগেই মিস্ট্রি সোল্ভ করে ফেলবেন। ফেলুদার কথা শুনে চুপসে গেলেন। ফেলুদা বলল খুনির সাহস আছে বটে। এমন সেনানিবাসে এসে মূল্যবান রত্ন চুরি করে নিয়ে যায়, গার্ডকে খুন করে যায়। ফেলুদা ল্যাপটপ ওপেন করে হিবিজিবি নোট করতে লাগল। আগে তদন্তের জন্য স্পেশাল খাতা ব্যবহার করত। ল্যাপটপ কেনার পর থেকে ল্যাপটপেই সব কাজ করে ও।

 

জটায়ু বলল চিন্তা করুন মশায় যে লোক একটা বুলেটের জন্য ১২ লাখ পাউন্ড হাঁকাতে পারে তার পক্ষে ২/১ হাজার পাউন্ড খরচ করে চোর ভাড়া করা মামুলি কাজ। আমার ধারনা সেই পিটারই টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে বুলেট চুরি করেছে। গার্ডকে খুন করেছে। ফেলুদা বলল আপনার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরাসরি নিতে না পারলে তাকে চুরি করতে হবে। কিন্তু এতেই প্রমাণ হয়ে যায় না পিটারই চোর, খুনি। আপনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ করতে পারেন না। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করাই গোয়েন্দাদের কাজ। কিন্তু আপনি হাঁটেন তার উল্টো পথে। জটায়ু তালুতে ঘুসি মেরে বলল এত তথ্য প্রমাণের দরকার নাই। পিটারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিলেই সব বের হয়ে আসবে। জটায়ু অবশ্য ভুল বলেন নাই। বাংলাদেশের পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে বাঘরেও ছাগল বানিয়ে দিতে পারে। জটায়ুর কথায় ফেলুদা কিছু বলল না।

 

জটায়ু কানে হেড ফোন লাগিয়ে গান শুনছেন। ফেলুদা কিছু ভাবছে। হঠাৎ আমাকে বলল আচ্ছা তোপসে চুরি হওয়া বুলেট টা কোথায় বিক্রি হতে পারে? আমি বললাম চোরাই মাল নিলাম করে কেউ বেচতে যাবে না। তাইলে ধরা পরে যাবে। তাই চোরাই মাল চোরাই মার্কেটেই যাবে। ফেলুদা বলল ঠিক বলেছিস। ৪/৫ দিনের ভিতরই কয়েক হাত ঘুরে বিদেশ চলে যাবে বুলেট বাবাজী। অবশ্য বেশি দামে বিক্রি করতে হলে বড় কোন পার্টি ধরতে হবে। সাধারণ পুরাতন লোহা ব্যবসায়ীরা কেজি দরেই নিবে। বড় বড় পার্টির খবর যেন তেন লোকেরা জানে না। মনে হচ্ছে চোর ডাক সাইটে কেউ হবে। লাই লাই লাই বার কয়েক বির বির করল ফেলুদা। আমার মনে হল এই লাই কথাটার ভিতরেই সকল রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু ফেলুদার চেহারা দেখে মনে হল না ও খুব একটা অগ্রসর হয়েছে।

 

সন্ধ্যা ৭ টায় একজন সেনা সদস্য এলো নাজমুলের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট নিয়ে। ফেলুদা রিপোর্ট হাতে নিয়ে বলল মৃত্যু হয়েছে ভারি কিছুর আঘাতে যেটা আমি আগেই অনুমান করেছিলাম। স্টিল জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল মাথার পিছনে। রিপোর্টে এ ছাড়া আর কিছু উল্লেখ নেই। চুরির মামলা এখন রুপ নিয়েছে খুনের মামলায়। ফেলুদা থাকতে পুলিশ আগে সমাধান করে ফেলবে এইটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। ফেলুদা হার মানবে কেমন জানি লাগে শুনতে। ফেলুদা বলল রিপোর্ট দেখে মনে হচ্ছে হত্যাকারী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আসে নি। আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে মাথায় আঘাত করা লাগত না। জটায়ুকে বলল ধরুন আপনাকে এমন একটি জায়গায় যেতে বলা হল যেখানে আপনি নির্ধারিত গেট ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রবেশ করার সময় তল্লাশি করা হয়।

 

সেখানে কি আপনি অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে যাবেন? জটায়ু মুখ বাকিয়ে বলল মাথা খারাপ। এমন এলাকায় অস্ত্র নিয়ে গিয়ে স্বেচ্ছায় এরেস্ট হব কোন দুঃখে? ফেলুদা বলল ঠিকই বলেছেন লালমোহনবাবু। কেউ ই এই কাজ করতে যাবে না। খুনি আসলে এই সেনানিবাসের ভিতরের কেউ। রাতে সেনানিবাসের ভিতর জন সাধারণের চলাচল নিষেধ। বাইরের কেউ ভিতরে ঢুকতে হলে সেনাদের অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয়। কাল রাতে অপরিচিত কেউ ভিতরে এসে থাকলে সেটা অবশ্যই সেনারা আমাকে জানাত। এ কারনেই আমার সন্দেহটা আরও দৃঢ় হচ্ছে। সেনানিবাসের ভিতর অবৈধ অস্ত্র নিয়ে কেউ চলতে পারে না। এ জন্যই আততায়ীকে নিরস্ত্র আসতে হয়েছে। এমন সময় দরজার কড়ায় নক পরল। আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। জেনারেল খায়রুল এসেছেন।

 

চেহারা দেখে বুঝলাম ভদ্রলোক অনেকটা মুষড়ে পরেছেন। ফেলুদার খাটেই এসে বসলেন। আমাদের খোজ খবর নিলেন। ফেলুদা বলল চোর, খুনি একই লোক তাতে সন্দেহ নাই। খুনি সেনানিবাসেরই কেউ। জেনারেল খায়রুল উত্তেজিত হয়ে বললেন খুনি সেনানিবাসের ভিতরের কেউ বলেন কি? ফেলুদা বলল হ্যা এখানেরই কেউ। রাতের বেলায় নির্ধারিত গেট ছাড়া সেনানিবাসে ঢুকা যায় না। খুনের রাতে বাইরে থেকে কেউ আসে নি সেটা আমাকে জানিয়েছে গেটে কর্তব্যরত গার্ডরা। খায়রুল বলল খুনি যেই হউক আপনি আগে তাকে শনাক্ত করুন। আমাদের নাকের ডগায় এসে মূল্যবান মাল চুরি করে নিয়ে যাবে আবার গার্ডকে খুনও করবে। এই খুনের কুল কিনারা করতে না পারলে আমাদের মান সম্মান থাকবে না। ফেলুদা শান্ত কণ্ঠে বলল আপনি ব্যস্ত হবেন না। খুনি ধরা পরবেই। আমি না পারলেও রানা নিশ্চয়ই পারবে। খায়রুল বলল যাই হউক মিস্টার মিত্তির আপনি তদন্ত চালিয়ে যান। যা কিছু লাগে আপনি আমাকে বলবেন। তদন্তের জন্য সব কিছুই পাবেন। আমি শুধু একবার খুনির চেহারাটা দেখতে চাই। এ কথা বলেই ভদ্রলোক রুম থেকে প্রস্থান করলেন।

 

জেনারেল খায়রুল চলে যাওয়ার পর আমি ফেলুদাকে বললাম আচ্ছা ফেলুদা ২/৩ জন লোক এসে গার্ড খুন করে বুলেট নিয়ে গেল অথচ টইল সেনারা কিছুই টের পেল না। জাদুঘরের সামান্য পশ্চিমেই সেনাদের চেক পোস্ট। অথচ ওরা কিছুই জানতে পারে নি। ফেলুদা বলল ভাল একটা পয়েন্ট ধরেছিস। তার মানে এই নয় যে সেনাবাহিনী এই চুরি, হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। দুর্নীতিতে জড়িয়ে সেনাবাহিনী নিজেদের বদনাম ডেকে আনবে না। কিন্তু তাদের চোখ ফাকি দিয়ে আততায়ী কি করে পালাল সেটা আমিও ভাবছি। ঠাণ্ডা লাগছে বলে জটায়ু শুতে গেলেন। আমিও আমার বেডে গিয়ে ল্যাপটপে গেমস খেলতে লাগলাম। ফেলুদা ল্যাপটপ ওপেন করে কি করছে সেটা এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে না। কখনই ঘুমিয়েছি টেরই পাই নি।

**************************

 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ফেলুদা জগিং করছে। ও কখন ঘুম থেকে উঠেছে জানি না। জগিং করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। জটায়ু এখনও ঘুম থেকে উঠেন নি। আমি ঠেলা দিতেই উনি আড়মর ভেঙ্গে ঘুম থেকে উঠলেন। আমরা ৩ জনেই বারান্দায় বেরিয়ে আসলাম। দূরে মাঠে কয়েকটা পাখি দেখা যাচ্ছে। জানি এই জোড়া রহস্যের কুল কিনারা না করা পর্যন্ত ফেলুদার মনে শান্তি থাকবে না। কাল যাওয়া হয় নি বিধায় আজ আমরা বার্ডে ঘুরব। কিছুক্ষণ বারান্দায় পায়চারি করে আমরা আবার রুমে ফিরে এলাম। মিনিট দশেক পর ব্রেকফাস্ট এলো। রুটি চিবাতে চিবাতে জটায়ু বলল আচ্ছা ফেলুবাবু তদন্তের ব্যপারে কতটুকু আগালেন? ফেলুদা বলল নাথিং। কাল যেখানে ছিলাম আজও সেখানেই আছে। পুরো এলাকাটা আরেকবার ঘুরে দেখতে পারলে হয়ত কিছুটা আগানো যেত। সকাল ৮ টায় গাইড মামুন আসলেন। তাকেও বিমর্ষ দেখাচ্ছে। আমরা বেরিয়ে পরলাম বার্ড দেখার উদ্দেশ্যে। তবে আজ আমাদের সাথে রানা নেই।

২০ মিনিট পর বার্ডের গেটে এসে পৌঁছলাম। সর্ব সাধারণের জন্য বার্ডে প্রবেশ নিষেধ। ফেলুদা গার্ডের হাতে জেনারেল খায়রুলের কার্ড দিতেই গেট খুলে দিল। গেটটা বেশ দৃষ্টি নন্দন। ভিতরে ঢুকে প্রথমেই মসজিদ। গেট থেকে দুটি রাস্তা দুদিকে গেছে। একটি সোজা দক্ষিণ দিকে, আরেকটি পূর্ব দিকে। আমরা সোজা দক্ষিণ দিকের রাস্তা ধরেই হাটতে লাগলাম। সামনেই বার্ড লাইব্রেরী। বার্ডের পুরো রূপ হচ্ছে Bangladesh Acedemy for Rural Developmen (BARD). ফেলুদা হয়ত মনে মনে তদন্ত করছে। কিন্তু ওর চেহারার দিকে তাকালে মনে হয় না এখনও পর্যন্ত কোন কুল কিনারা করতে পেরেছে। মামুন বার্ডের ইতিহাস বলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড)  স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে পল্লী উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রায়োগিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত একটি স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এটি ১৯৫৯ সালে কুমিল্লা জেলার কোটবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন  আখতার হামিদ খান

বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর কার্যক্রম একটি বোর্ড অব গভর্নর্স কর্তৃক পরিচালিত হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এ বোর্ডের চেয়ারম্যান। প্রশাসনিকভাবে বার্ড স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত। মহাপরিচালক বার্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। বার্ড  ৯ টি অনুষদে বিভক্ত এবং প্রতিটি অনুষদ পরিচালিত হয় একজন পরিচালকের অধীনে। প্রতিটি অনুষদ আবার দুটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত, যথা সার্ভিস বিভাগ ও একাডেমী বিভাগ। সার্ভিস বিভাগের আওতায় রয়েছে প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকল্প এবং প্রশাসন। একাডেমী বিভাগের অধীনে রয়েছে পল্লী প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার, পল্লী অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা, পল্লী শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়ন, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান ও জনসংখ্যাতত্ত্ব এবং কৃষি ও পরিবেশ। বার্ড ক্যাম্পাসে রয়েছে ৫ টি হোস্টেল, ৪ টি কনফারেন্স কক্ষ, ২ টি ক্যাফেটেরিয়া, ১ টি মসজিদ, ১ টি গ্রন্থাগার ও ১ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

পরিকল্পনা ও প্রকল্প তৈরির জন্য আর্থ-সামাজিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বার্ড গবেষণা পরিচালনা করে। এ গবেষণা কাজ পরিচালনার জন্য বার্ডের রয়েছে মাল্টি ডিসিপ্লিনারি অনুষদ। গবেষণার ফলাফল একাডেমীতে প্রশিক্ষণ উপকরণ হিসেবে এবং উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন ও নীতিনির্ধারকগণ কর্তৃক তথ্য-উপাত্ত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া একাডেমী এককভাবে অথবা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির মূল্যায়নেও নিয়োজিত।

এইটুকু বলে মামুন থামল। বার্ডের ভিতরটা বেশ গুছানো। একে মডেল গ্রামের প্রতীকী বলা যায়। লাইব্রেরী দেখা শেষ করে আমরা পূর্ব দিকে গেলাম। ক্যান্টিন পেরিয়ে খোলা মাঠ। মাঠের উপর দূর্বা ঘাস। জটায়ু একটু বেখেয়ালেই হাঁটছেন। হঠাৎ তিনি গর্তে পরে গেলেন। আমরা তো অবাক। এখানে গর্ত এলো কি করে। তবে জটায়ু ব্যথা পান নি। ফেলুদা এগিয়ে এলো। ও গভীরভাবে স্থানটা পরীক্ষা করতে লাগল। সব দেখে ফেলুদা বলল গর্তটা আসলে উপর থেকে একটি স্টিলের ঢাকনা দ্বারা ঢাকা ছিল। জটায়ুর পায়ের ধাক্কায় সেটি সামনের দিকে সরে যায়। অথচ জটায়ু গর্তে পরে না গেলে কেউ কোন দিন কল্পনাও করতে পারত না এখানে একটি গর্ত আছে। ধন্যবাদ মিস্টার লালমোহন গাঙ্গুলী। পেয়ে গেছি। আমি বললাম কি পেয়েছো?

ফেলুদা বলল ক্লু।

 

এই একটা গর্তের ভিতর ক্লু এর কি আছে সেটাই আমি বুঝলাম না। অবশ্য গোয়েন্দারা ছোট খাট বিষয়কেও অবহেলা করে না। তবে জানি ফেলুদা যে ক্লু পেয়েছে সেটার হাত ধরে ও রহস্যের সমাধান করবেই। ফেলুদার নির্দেশে আমি স্টিলের ঢাকনাটা আবার গর্তের উপর রেখে দিলাম। মামুন বলল এইদিকে দেখার মত কিছুই নাই। কেবল গাছ আর ঘাস। আমরা রাস্তার মোড় পরিবর্তন করে দক্ষিণ দিকে চললাম। একে একে বার্ডের ভিতরের সব কিছুই দেখা হয়ে গেছে। আমরা পুনরায় বার্ডের গেটে ফিরে আসলাম। মামুন বিশেষ কাজ আছে বলে গেট থেকেই ফিরে গেল। গাড়িতে করে আমরা ৩ জন ফিরে এলাম বাংলোতে। ড্রাইভার আমাদের নামিয়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। তখন বেলা প্রায় ১২ টা বেজে গেছে। রুমে ফিরে জটায়ু বলল মশাই শরীরটা কেমন ক্লান্ত লাগছে। একটু বিশ্রাম করা দরকার। সত্যি বলতে কি আমারও ক্লান্তি লাগছে। আজ অনেক হেঁটেছি। ফেলুদা বলল আপনারা ঘুমিয়ে পরেন। আমি সময়মত জাগিয়ে দিব। ফেলুদার আদেশ পেয়ে বিছানায় পিঠ দিতেই কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পাই নি। ঘুম থেকে উঠে দেখি ফেলুদা গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। ফেলুদা আমাকে জাগিয়ে দিতে হয় নি। এমনিতেই আমার ঘুম ভেঙ্গেছে। জটায়ু আমার আগেই উঠেছেন। দুজনেই বাথরুম থেকে গোছল সেরে আসলাম।

*****************************

 

বিকালে ফেলুদা বলল তোরা বাসায় থাক। আমাকে অনেক জায়গায় যেতে হবে। নতুন পাওয়া ক্লু এর ভিত্তিতে আমাকে এগুতে হবে। এ ছাড়া কোন রাস্তা নেই। বলেই ফেলুদা বেরিয়ে গেল। ফেলুদা কোথায় গেল জানি না। আমি আর জটায়ু রুমে বসে রইলাম। জটায়ু বলল তোমার দাদা যতই পাত্তা না দেউক না কেন আমার সন্দেহ পিটারের উপর থেকে যাচ্ছে না। অঢেল টাকার মালিক। তার পক্ষে ভিতরের লোক ম্যানেজ করাও অসম্ভব না। কড়কড়ে টাকা ঢাললে সবই সম্ভব। রুমে বসে অলস সময় কাটছিল। আমি বললাম চলুন বাইরে থেকে ঘুরে আসি। জটায়ুও এটাই চাচ্ছিলেন। বলল আমরা আড্ডাবাজ মানুষ। বিকেল বেলায় একটু আড্ডা মারতে না পারলে দম ফুরিয়ে আসে। দুজনেই রুম থেকে বেরিয়ে এলাম। একটা টি স্টল থেকে চা খেয়ে সোজা উত্তরে হাটতে লাগলাম। কোথায় যাচ্ছি জানি না। আনমনেই হাঁটছি। লালমোহনবাবু বললেন চল ভাই জাদুঘরটা আরেকবার দেখে আসি। ওখানেই তো চুরি, খুনের ঘটনা ঘটল। আমার ইচ্ছাও ছিল তাই। কাজেই আমরা রওনা দিলাম ময়নামতি জাদুঘরের দিকে। জটায়ু হয়ত নিজের মত করেই তদন্ত করছেন।

আমরা জাদুঘরে পৌছে দেখি লোকজন নেই। পুলিশ পাহারা তুলে নিয়েছে। শুধু গেটের সামনে একজন সেনা সদস্য বসে রয়েছে। বুলেট চুরি হওয়ার পর জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেনা সদস্য হয়ত আমাদেরকে চিনে রেখেছিল। ভিতরে ঢোকার কথা বলতেই গেট খুলে দিল। জাদুঘরে ঢুকার একটাই পথ। রাতের বেলায় ভিতর থেকে তালা দেওয়া থাকে। গেট খুলে চোর ভিতরে ঢুকল কিভাবে সেটাই ভাবছি। আমি আর জটায়ু প্রথম তলা পেরিয়ে দোতলায় উঠে গেলাম। আবারও সব কিছু অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখছি। হঠাত জাদুঘরের দোতলার বারান্দা থেকে দেখলাম পূর্ব দিক দিয়ে সরু একটা রাস্তা আছে যেটা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে ঝোপ ঝাড়ের আড়াল দিয়ে। এরপর আমি দ্রুত নিচে নেমে জাদুঘরের পিছন দিকে চলে গেলাম। পিছন দিয়ে উঁচু পাচিল দেওয়া। আন্দাজে বুঝলাম আততায়ী এই সরু পথ দিয়ে এসে পাচিল টপকে ভিতরে ঢুকেছে। একজনের কাঁধে উঠে আরেকজন পাচিল টপকানো খুবই সহজ কাজ। পিছনের রাস্তাটা নির্জন। এ কারনে খুব সহজেই ওরা অপারেশন সাকসেসফুল করত পেরেছে। আমরা জাদুঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে ঢুকলাম। এ প্রতিষ্ঠানটি সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত। দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছরই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ৮০% ছাত্র-ছাত্রী এ প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। কলেজের ভিতরের পরিবেশটা চমৎকার। শিক্ষার জন্য তো এমন পরিবেশই চাই। ইস্পাহানী কলেজ থেকে বেরিয়ে সেনানিবাসের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে বাসায় ফিরলাম। গিয়ে দেখি ফেলুদা তখনও ফিরে নি।

 

চোর এসেছে পিছনের রাস্তা দিয়ে। খবরটা ফেলুদাকে দিতে হবে। ফেলুদা এলো রাত ৮ টায়। ওর হাতে একটা টর্চ লাইট। আমি বললাম টর্চ লাইট কোথায় পেলে? ফেলুদা বলল সে খবর পরে শুনিস। আগে এক গ্লাস পানি দে। আমি জগ থেকে পানি ঢেলে ফেলুদার হাতে দিলাম। ফেলুদা এক ঢোকে সাবাড় করে দিল। বুঝলাম ও অনেক ক্লান্ত। জটায়ু ভাবছিলেন চোর পাচিল টপকে আসার খবরটা ফেলুদাকে বলে নতুন কিছু আবিষ্কারের কৃতিত্ব নিবেন। ফেলুদা সব শুনে বলল এসব পুরানো খবর। নতুন কিছু থাকলে বলেন। আমি এখান থেকে বের হয়েই জাদুঘরের পিছনের দিকটা ঘুরে দেখে এসেছি। আজকের অপারেশন খুব একটা ব্যর্থ হয় নি। জটায়ু বলল কতদূর আগালেন? ফেলুদা বলল এই ধরেন ফিফটি ফিফটি অবস্থানে আছি। পুরো রহস্য উদঘাটন করতে আরও কয়েকদিন লাগবে।

 

ডিনার শেষ করে ফেলুদা ল্যাপটপ নিয়ে বসল। ফেলুদা বলল রানা থাকলে ভাল হত। কিন্তু রানা এই মুহূর্তে আরেক কাজে ব্যস্ত আছে। ফেলুদা ল্যাপটপে কি সব হিবিজিবি লিখছে। খুনি কে? বুলেট গেল কই? নাজমুলকে আঘাত করা হয়েছে কি দিয়ে? কারও বাসায় লাইট পাওয়া দ্বারা কি প্রমাণিত হয় সেই খুনি? খুনি কি একাই নাকি একটা সংঘবদ্ধ চক্র? পুলিশ কি খুনিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? আমি বললাম টর্চ লাইট কি তুমি কারও বাসা থেকে এনেছো?

 

ফেলুদা বলল ঠিকই ধরেছিস। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ আলামত বলতে পারস। প্রায় চুরি করেই এনেছি। এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না। বুলেট সম্ভবত পাচার হয়ে গেছে। বুলেট উদ্ধার করার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমি বললাম আচ্ছা ফেলুদা চোর যদি এখানেরই কেউ হয়ে থাকে তাইলে তার জানার কথা পিটার ১২ লাখ পাউন্ডে বুলেটটি কিনতে চেয়েছিল। সহজে পাচার করার জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হবে পিটার। ভুলে গেলে চলবে না পিটার যে কোন মূল্যে বুলেটা টা পেতে চাইছিল। চোরাইপথে পেলে তো তিনি খুশিই হবেন। ফেলুদা আমার পিঠ চাপরে দিয়ে বলল তোর বুদ্ধি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা তার প্রমাণ। পিটারের ঠিকানা জানা চোরের পক্ষে খুবই সহজ।

কালই একবার পিটারের কাছে যেতে হবে। তার কাছে যদি বুলেট টা থেকেই থাকে তাহলে পুলিশকে দিয়ে সেটা উদ্ধার করাতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে বেআইনি ভাবে ঐতিহাসিক কিছু কেনা যায় না।

*****************************

 

গভীর রাত। কিছু একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমার পিছনের জানালার সাথে খট খট আওয়াজ হচ্ছে। বুঝলাম কেউ একজন জানালা খোলার চেষ্টা করছে। ভয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। এই শীতের রাতেও ঘামছি। জানালা ভিতর থেকে বন্ধ করা। খুলতে পারবে না। আমি চুপিসারি ভিতর থেকে দেখতে চেষ্টা করলাম বাহিরে কি হচ্ছে তা দেখার। কুয়াশা আর গাঢ় অন্ধকারের কারনে কিছুই বুঝা গেল না। আমি নড়াচড়া করাতে শব্দ হওয়ায় বাইরে খুটখুটানি বন্ধ হয়ে গেল। আমি চাপা স্বরে ফেলুদাকে ডাক দিলাম। ২/৩ বার ডাক দিতেই ফেলুদার ঘুম ভেঙ্গে গেল। বলল চিল্লাচ্ছিস ক্যান? ফেলুদার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই টের পেলাম কি একটা হুরমুর করে কার্নিশ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। আমি ফেলুদাকে সব বললাম। আমার কথার আওয়াজে ততক্ষণে জটায়ু ও জেগে উঠেছেন। ফেলুদা দ্রুত দরজা খুলে সেনা গার্ডদের জাগিয়ে দিল।

 

বাংলোর গেট রাতের বেলায় বন্ধ থাকে। তাই পিছন দিয়ে এসেছিল। সেনা সদস্যরা বাংলোর পিছনে গিয়ে ধাওয়া করল। কিন্তু এত ঘন কুয়াশার মধ্যে লাইট দিয়ে ২০ হাত দুরেও কিছু দেখা যায় না। অনেক খুঁজাখুঁজি করে কাউকে না পেয়ে সেনা সদস্যরা ফিরে এলো। ফেলুদার মুখ গম্ভীর। বলল আমি যে তদন্ত করছি সেটা খুনি কোনভাবে জানতে পেরেছে। তাই আমাকে শাসাতে এসেছে। আমরা সবাই আবার ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি ফেলুদা আর জটায়ু তখনও ঘুমাচ্ছে। আমি বুঝিনা ও একটা লাইটের মাধ্যমে কিভাবে জোড়া রহস্যের সমাধান করবে। তবে ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সমাধানের কাছাকাছি এসে গেছে। সকালে সেনারাই জেনারেল খায়রুলকে খবর দিয়েছিল আমাদের উপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। জেনারেল খায়রুল আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করলেন। বাংলোর চতুর্দিকে টইল সেনা মোতায়েন করলেন।

 

আজ ফেলুদা যাবে পিটারের কাছে। ৩ জন একসাথে গেলে পিটার সন্দেহ করতে পারে। তাই ফেলুদা একাই যাবে। আমরা যাব কুমিল্লা শহরে ধর্মসাগর দেখতে। তিনজন একসাথেই বেরোলাম। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পিটারের ভিজিটিং কার্ড নিয়ে নিয়েছে ফেলুদা। পিটারের কুমিল্লা ইপিজেডে কয়েকটা ফ্যাক্টরি আছে। দিনের বেলায় ঐখানেই থাকেন। ইপিজেডও কুমিল্লা শহরেই। টমছম ব্রিজ পর্যন্ত আমরা একসাথে যাব। সেখান থেকে ফেলুদা চলে যাবে ইপিজেডে আর আমরা যাব ধর্মসাগর পাড়ে। গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ি ছেড়ে দিল। সেনানিবাস থেকে কুমিল্লা শহরের দূরত্ব বেশি না। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে একটি সংযোগ সড়ক টমছম ব্রিজ গিয়ে মিলেছে। ফেলুদা গাড়িতে বলল তোরা যেহেতু ধর্মসাগর পাড় যাবিই তাই যাওয়ার পথে ভিক্টোরিয়া কলেজটি দেখে যাইস। বৃটিশদের হাতে গড়া এই কলেজ।

 

টমছম ব্রিজ গিয়ে ফেলুদা নেমে গেল। সত্যি বলতে কি গতকাল রাতের ঘটনার পর ফেলুদাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছিল না। তারপরও তদন্তের স্বার্থে যেতেই হচ্ছে। গাড়ি আমাদের সাথেই আছে। টমছম ব্রিজ থেকে সোজা উত্তরে চলল গাড়ি। ভিক্টোরিয়া কলেজের গেটে গিয়ে থামাল। আমি আর জটায়ু গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৮৯৯ সালে। এটি ইংরেজদের শিক্ষা বিস্তার কর্মসূচীরই ফলাফল। রাণী ভিক্টোরিয়ার নামে এই কলেজের নামকরণ করা হয়। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি। আমরা যেখান আছি সেটা ইন্টারমিডিয়েট শাখা। অনার্স ও ডিগ্রী শাখা আরেক জায়গায়। ১০ মিনিটের ভিতর পুরো কলেজটি চক্কর দিয়ে আমরা গাড়িতে ফিরে এলাম। রিকশার জ্যাম ঠেলে আমরা একবারে ধর্মসাগরের দক্ষিণ গেটে নামলাম।

 

সাগর বলতে যা বুঝায় এটি আসলে তা নয়। অনেক বড় একটি দীঘি। আমরা ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড় ধরে উত্তর দিকে এগুতে লাগলাম। মানুষে গিজগিজ করছে। হাটতে গেলে একজনের সাথে আরেকজনের শরীর লেগে যাচ্ছে। বদ্ধ হলেও ধর্মসাগরের পানি বেশ স্বচ্ছ। ঝকঝকে পরিষ্কার। অনেকেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। আরেকদল নৌকা দিয়ে সাগরের মাঝখানে চলে গেছে। কয়েকজন লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজা মহারাজ ধর্মমাণিক্য ১৪৫৮ সালে এই দীঘি খনন করেন। মূলত কুমিল্লা শহরের আশে পাশের লোকদের পানি সংকট নিরসনের জন্যই তিনি এই দীঘি খনন করেন। তার নামানুসারেই এই দীঘির নাম রাখা হয় ধর্মসাগর। দীঘিটি প্রায় ২৪ একর জায়গার উপর অবস্থিত। জটায়ু বলল জান তোপেশ মন চাইতেছে এমন স্বচ্ছ নির্মল ঝর্ণার মত পানিতে নেমে সাতার কাটতে। আমাদের সাথে বাড়তি কাপড় না থাকায় জটায়ুর ইচ্ছে পূরণ করা সম্ভব ছিল না।

 

আমরা পৌঁছে গেলাম ধর্মসাগরের উত্তর মাথায়। ধর্মসাগর যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে থেকেই শুরু হয়েছে কুমিল্লা পার্ক। পার্কে কপোত কপোতীরা বসে ডেটিং করছিল। ওরা এমনভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছিল যে আমার তাকাতে রীতিমত লজ্জাই লাগছিল। উত্তর পাড়ে গিয়ে দক্ষিণ-মুখো হয়ে বসলাম। আজ কুয়াশা নেই। রোদও উঠেছে। তাই দর্শনার্থীদের ভিড়ও বেশি। আমি জটায়ুর মোবাইল দিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে দিলাম। ধর্মসাগরের পূর্ব পার্শে কুমিল্লা জেলা স্টেডিয়াম। আমরা ধর্মসাগরে থাকলেও আমার মন পরে আছে ফেলুদার কাছে। পিটারের কাছে যদি বুলেট পাওয়া যায় তাইলে তো ভালই। কিন্তু যদি না পাওয়া যায় তাইলে ফেলুদা কি করবে? কি করে উদ্ধার করবে চুরি হয়ে যাওয়া বুলেট? জাটায়ু বলল একটু চা কফি হলে মন্দ হত না তপেস। আমার ইচ্ছে করছিল না চা/কফি খেতে। তবুও উঠে গিয়ে কনফেকশনারীতে গিয়ে কফির অর্ডার দিলাম।

 

কনফেকশনারীটা ধর্মসাগরের উত্তর পাড় লাগোয়া। ভিড় লেগেই থাকে। দোকানদার দিয়ে কুল পাচ্ছে না। কফির অর্ডার দিয়ে হাতে পেতে লাগল ৫ মিনিট। কফিতে চুমুক দিয়ে বুঝলাম স্বাদটা ভালই। আমাদের কফি খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় লালমোহনবাবুর মোবাইলে একটি মেসেজ আসল। উনি কয়েকবার পড়েও ইংরেজি পুরোপুরি বুঝতে না পেরে আমার কাছে দিল। মেসেজ পড়েই আমার সমস্ত শরীর দিয়ে ভয়ের স্রোত বয়ে গেল। মেসেজে লেখা আছে “Mr. Lalmohon Ganguly, If you want to save you and your friend Prodosh Mitro, go back India. It’s not Kalkata. Be aware”. মেসেজটা এসেছে একটা গ্রামীনফোন নাম্বার থেকে। আমি আর এখানে থাকা সমীচীন মনে করলাম না। কে জানে হয়ত হুমকীদাতা এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। দ্রুত গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। ড্রাইভারকে বললাম বাংলোতে চলেন।

বাংলোতে পৌছে দেখি ফেলুদা আমাদের আগেই এসেছে। আমি ফেলুদাকে মেসেজটা দেখালাম। ফেলুদা দেখে বলল এইসব হুমকি ধামকীতে প্রদোষ মিত্র ভয় পায় না। ভয় পাওয়া গোয়েন্দাদের স্বভাবও না। মেসেজটা যে পাঠিয়েছে তাকে ধরতে পারলেও অনেক তথ্য পাওয়া যেত। কিন্তু কেউ এত কাচা করবে না যে যাতে তাকে সহজেই ধরা যায়। ফেলুদা ফোন করে রানাকে বলল একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ করে আমাদেরকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আপনি ফোন নাম্বার ট্রেক করে মেসেজ সেন্ডারকে ধরা যায় কিনা সেই ব্যবস্থা করুন। ফেলুদা ফোন শেষ করে বলল রানা র‍্যাবকে সব কিছু জানিয়ে দিবে। র‍্যাব বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে নাম্বারের লোকেশন ট্রেক করবে। আমি ফেলুদাকে বললাম আচ্ছা পিটার থেকে কি খবর পেলে? ফেলুদা বলল পিটার যেদিন মিউজিয়ামে এসেছিল সেদিন রাতেই চট্ট্রগ্রামে চলে যান ব্যবসায়ীক কাজে। ফিরবে আগামী পরশু। আমি ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এসেছি। আমি বললাম তার মানে বুলেট এখনও খুনির কাছেই আছে। নির্বিঘ্নে যাতে পাচার করতে পারে তাই আমাদেরকে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

*******************************

 

বিকেল বেলায় জেনারেল খায়রুল, রানা ও একজন র‍্যাব কর্মকর্তা আমাদের কক্ষে এলেন। র‍্যাব অফিসারের নাম বোরহান। বোরহান বললেন আপনাদেরকে যে নাম্বার থেকে হুমকি দিয়ে মেসেজ পাঠানো হয়েছিল সে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আইএমইআই ট্রেক করে ঐ মোবাইলে বর্তমান সিমের নাম্বার বের করা হয়। নতুন নাম্বারটি ট্রেক করে খোজ নিয়ে দেখা যায় ওটি একটি ফ্লেক্সি লোডের দোকান। দোকানী ঐ সিমটা খুলে ফেলেছিল। হুমকিদাতা নিরাপদ থাকতে ফ্লেক্সি লোডের দোকান থেকে মেসেজ করেছে। জেনারেল খায়রুল বলল খুনি তো দেখছি বড্ড ডেঞ্জারাস। পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নি। তাহলে কি খুনি ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাবে। না এ হতে পারে না। মিস্টার মিত্তির আপনি কতদূর এগুলেন? ফেলুদা বলল আলামত হিসেবে একটা টর্চ লাইট পেয়েছি। আপাতত এই ক্লু ধরে সামনে এগুতে হবে। খুনি কে, বুলেট কোথায় আছে সেটা জানতে হলে আরও তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। আমার কাছে সব কিছু এখনও ধোয়াটে লাগছে।

 

বোরহান বললেন কই টর্চ লাইট? একটু দেন চে দেখি। ফেলুদা ওর ব্যাগ থেকে টর্চ লাইট বের করে র‍্যাব অফিসারের হাতে দিয়ে দিল। বোরহান লাইট টা কয়েকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে ফেলুদার হাতে দিয়ে বলল মনে হয় না এর মাঝে হত্যাকাণ্ড, চুরির কোন আলামত আছে। এই লাইট অন্ধকারে পথ দেখার কাজে ব্যবহৃত হয়। আলোর বেশ তেজ। খুনি যদি এই লাইট নিয়েই চুরি করতে গিয়ে থাকে তাইলে এটার আলো টইল সেনাদের চোখে পরত। ফেলুদা চুপ করে রইল। যুক্তি আছে বোরহানের কথায়। সবাই চলে গেল। রানা যাওয়ার সময় শুধু একটা কথাই বলল মিস্টার মিটার আশা করি আপনার ধুয়াশার জাল আগামীকাল কিছুটা পরিষ্কার হবে। আমার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও জেনারেল খায়রুল স্যারের নির্দেশে তদন্তে নামতে পারছি না। বলেই রানা চলে গেল। ওরা যখন চলে যায় তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ফেলুদা বলল রাতের বেলায় বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়। তাই রুমেই বসে রইলাম।

 

রাতে ফেলুদা টর্চ লাইট বের করে কয়েকবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। দেখে মনে হল না ওর ধুয়াশা কেটেছে। জটায়ু বলল আপনি এই এক টর্চ লাইটের পিছনে পরে আছেন কেন বুঝতে পারছি না। নিশ্চয়ই পিটার ফিরলেই চোর ব্যাটা যাবে বুলেট বিক্রি করতে। পিটারের কোম্পানির সামনে পাহারা বসালেই তো হয়। মামলা খালাস। সহজ ব্যপার। ফেলুদা বলল ব্যপারটা এত সহজ হলে তো কথাই ছিল না লালমোহনবাবু। চোর অনেক ধুরন্ধর লোক। সে তো পিটারকে ফোন করে অন্য জায়গায় ডেকে নিয়েও বিক্রি করতে পারে। তখন আপনি পিটারের অফিসের সামনে পাহাড়া বসিয়ে কি করবেন? ফেলুদার কথা শুনে জটায়ু দমে গেল। আমি বললাম যার বাসায় থেকে লাইট এনেছো তুমি কি তাকেই অপরাধী মনে করেছ? ফেলুদা বলল কারও বাসায় একটা লাইট পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই বুলেট চুরি করেছে, খুন করেছে। এটা করেছি স্রেফ সন্দেহের বশে। আমি জানি ফেলুদার সন্দেহ কখনও মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। আর ও যে সন্দেহের সূত্র ধরে অনেক দূর এগিয়েছে সেটা বুঝা যায় ওর চোখ মুখ দেখলে।

 

ডিনার সেরে আমি বসে বসে মুভি দেখছি। ফেলুদা এক মনে ভাবছে। লালমোহনবাবু তার স্ত্রীর সাথে স্কাইপে কথা বলছেন। বাংলোর চারদিকে সেনারা ক্রমাগত চক্কর দিয়েই চলছে রাইফেল হাতে। জেনারেল খায়রুলের কড়া নির্দেশ ছিল সারা রাত টইল দিতে হবে। ঘুমানো যাবে না। আমরা ঘুমিয়ে গেলাম রাত ১১ টায়। ফেলুদা হয়ত শুয়ে শুয়ে ভাবছে। তবে আমার ঘুম আসছে না। মিনিট দশেক পর লালমহনবাবুর নাক ডাকার শব্দ শুনে বুঝলাম উনি গভীর ঘুমে অচেতন। আমার কিছুটা ভয় করতে লাগল। আততায়ী অনেক ডেঞ্জারাস। সেনানিবাস এলাকায় এসে হামলা করার সাহস দেখায়। রাতে কখন ঘুমিয়ে ছিলাম কিছুই টের পায় নি। সকালে ঘুম ভাঙ্গল ফেলুদার ডাকে। ঘুম থেকে উঠে বাথরুম সেরে ফ্রেশ হয়ে আসলাম। আজ কেউ জানালা খুলতে আসে নি। সেই আশংকাও ছিল না। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে একজন সেনা সদস্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল।

 

নাস্তা শেষ করে ফেলুদাকে বললাম আজ কোথায় যাবে? ফেলুদা বলল মনে হচ্ছে বাসায়ই থাকতে হবে। পিটার কুমিল্লায় ফিরা না পর্যন্ত কিছুই করার নেই। যা ঘটার পিটার আসলেই ঘটবে। সন্দেহভাজনদের বাড়িতে নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে পিটারের কাছে বুলেট পৌছার আগেই ধরে ফেলা যায়। তার আগে অপরাধী ধরা পরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কাজেই পিটারের জন্য অপেক্ষা করতেই হচ্ছে। ফেলুদার কথা শেষ না হতেই কক্ষে প্রবেশ করল মামুন। ঢুকেই ফেলুদাকে বলল আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। ভদ্রলোক নাকি আপনার বিরাট ফ্যান। না গেলে মাইন্ড করবেন। এখানে আসার অনুমতি থাকলে উনি নিজেই চলে আসতেন। এমন করে বলেছে। অগত্যা ফেলুদা অনিচ্ছা থাকা স্বত্বেও যেতে রাজি হল। আমরা রেডি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম।

 

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শালবন বিহারের দিকে। যেখানে আগেই আমরা গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে দেখলাম কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ। বাংলাদেশে প্রত্যেক সেনানিবাসের সাথেই একটি করে ক্যাডেট কলেজ থাকে। মামুনের কণ্ঠ আজ কেমন যেন শুনাচ্ছে। সম্ভবত সর্দি লাগায় এ অবস্থা হয়েছে। আমরা শালবন পেরিয়ে আরও সামনে এগিয়ে চললাম। ২ মিনিটের ভিতরই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছলাম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে পাহাড়ি এলাকায়। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। একটা বিষয় লক্ষ করলাম যে কুমিল্লা সেনানিবাস অঞ্চলে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সবগুলাই মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। শোনা যায় খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতকে বিখ্যাত চীনা পরিজ্রাবক ফা হিয়েন এখানে আগমন করেছিলেন। তিনি এ এলাকার পরিবেশ দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তার বইয়ে সেটা উল্লেখ করেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে লালমাই পাহাড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের মাটিও লাল। মনে হচ্ছে লালমাই পাহাড়ের কোন অংশ। আমরা কলা ভবন ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ দেখলাম। কিছু কিছু রুমে ক্লাস হচ্ছে। অধিকাংশ রুমই খালি পরে আছে। কলা ভবন পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে গেলাম। ঐখানে বেশ উঁচুতে একটা ভবন। আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। জটায়ু বলল এখানে একটা লিফট স্থাপন করা উচিত। ফেলুদা জটায়ুর কথাকে খুব একটা পাত্তা দিল না। শুধু বলল এমন পাগলামো ধারনা কেবল আপনার মাথা থেকেই বের হবে। গাইড মামুন বলল অধ্যাপকের কমন রুম আরও পশ্চিমে। পশ্চিম দিকে আরও একটা বিল্ডিং আছে। ঐখানেই বসেন অধ্যাপক শারাফাত হোসেন। আমরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। এরপর এমন ঘটনা ঘটল যা ভাবতে গেলে ভয়ে আমার সর্ব শরীর শিউরে উঠে। সর্বাঙ্গ কাটা দিয়ে উঠে।

 

আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেমে একটু পশ্চিমে হেটে যেতেই গাইড মামুন আচানক ফেলুদার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলল যদি প্রাণের আশা থাকে তাহলে আপনার রিভলভারটা ফেলে দিন। মামুনের এমন আচরণে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। একেই কিনা মাসুদ রানা এতদিন বিশ্বাস করে আসছিল। কিন্তু মামুন আমাদের পিছনে লাগল কেন সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। ফেলুদা জানে এই অবস্থায় আত্নসমর্পন করা ছাড়া উপায় নাই। তাই সে রিভলভারটা মামুনের হাতে দিয়ে দিল। জটায়ু দেখলাম ভয়ে কুচকে গেছেন। মামুন বলল আমার আদেশের নড়চড় হবে তো মাথার খুলি উড়ে যাবে। ভাল চান তো আমার সাথে সাথে চলুন।

 

খুলি উড়বে তোমার প্রদোষ মিত্রের নয়। আচমকা একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো উপর থেকে। তাকিয়ে দেখি গাছে বসে আছে মাসুদ রানা। তার রিভলভার মামুনের দিকে তাক করা। রানা বলল নড়াচড়া করবে না। আঙ্গুলের একটা টিপই যথেষ্ট তোমাকে ওপারে পাঠিয়ে দিতে। যদি নিজের ভাল চাও তো অস্ত্র মাটিতে ফেল। মামুন নির্বিকার। রানা আবার বলল আমি ৫ গোনার ভিতর রিভলভার ফেলবে। অন্যথায় আমি গুলি করতে বাধ্য হব। রানা গুনতে শুরু করলেন ১….২… ৩। অস্ত্র মাটিতে ফেলে দিল মামুন। ছাড়া পেয়ে সাথে সাথেই ফেলুদা মামুনের কলার জাপটে ধরল। এক টানে মামুনের দাড়ি, গোফ টেনে খুলে ফেলল। আমি থ বনে গেলাম। আমরা এতক্ষণ যাকে মামুন ভাবছিলাম সেতো মামুন নয়। মামুনের ছদ্মবেশ ধরে এসেছিল। দাড়ি, গোফ সবই নকল ছিল। মামুনের মুখভর্তি দাড়ি ছিল। তাই একে বেশি মেকাপ করতে হয় নি। এতক্ষণে বুঝলাম কেন আজ মামুনের কণ্ঠস্বর অন্য রকম শুনাচ্ছিল। আর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের সাথে দেখা করার ব্যপারটিও ছিল ভুয়া।

 

ততক্ষণে রানা নিচে নেমে এসেছে। নিচে এসেই জেনারেল খায়রুলকে ফোন দিল পুলিশ নিয়ে আসতে। রানা বলল অপরাধী ময়নামতি মিউজিয়ামেরই কর্মচারী। তার নাম রায়হান। আমার মনের অবস্থা তখন যে কি সেটা লিখে বুঝাতে পারব না। আজ সময়মত রানা না থাকলে কি যে হত। প্রায় ২৫ মিনিট পর জেনারেল খায়রুল, মিউজিয়াম কিউরেটর আদনান ও কয়েকজন পুলিশ আমাদের কাছে এসে পৌছালো। রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হল। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হল। জেনারেল খায়রুল বলল আমি অত্যন্ত দুঃখিত মিস্টার মিত্তির। আপনাদেরকে এইভাবে গার্ড ছাড়া ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয় নি। কিন্তু কিভাবে ঘটল আপনাদের সাথে এ ঘটনা? ফেলুদা বলল আমাকে বলা হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক আমার ভক্ত। উনি আমার সাথে দেখা করতে চান। তারপর আমাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়। এখানে এসে হঠাৎ করেই অস্ত্র ঠেকিয়ে আমাদেরকে জিম্মি করে ফেলা হয়। এরপর রানা আমাদেরকে উদ্ধার করে। খায়রুল রানার দিকে তাকিয়ে বলল তুমিই বা সময়মত এখানে এলে কিভাবে? রানা বলল সে কথা বাসায় গিয়ে বলব। আগে বাসায় চলুন।

 

রায়হানকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়েছে। আমরা খায়রুলের গাড়িতে করেই বাংলোতে ফিরে এলাম। পুলিশ রায়হানকে থানায় নিয়ে গেছে। তবে ওসি ইকরাম আমাদের সাথেই এলেন। খায়রুলের রুমে আমরা সবাই গোল হয়ে বসলাম। রানা বলতে লাগল জাদুঘরে বুলেট চুরি হওয়ার পরের দিন আমি জাদুঘরে যাই। মারা যাওয়ার আগে নাজমুল আমাদেরকে বলেছিল তার পিছন দিয়ে এসে জাপটে ধরে ২/৩ জন লোক। প্রহরী থাকে গেটের ভিতরে। গেট ভেঙ্গে কেউ আসলে অবশ্যই নাজমুল দেখতে পেত এবং বাধা দিত। কিন্তু ওরা এসেছিল জাদুঘরের পিছনের দেওয়াল টপকে। আর জাদুঘরের পিছনের এই সরু রাস্তার কথা বাইরের কেউ জানে না। তাই আমার মনে হল চোর জাদুঘরেরই কেউ। সে জন্য আমি জাদুঘরের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ইমেইল করি একটা অপরিচিত আইডি থেকে। ইমেইলে লেখা ছিল বেশি দামে বুলেট বিক্রি করতে চাইলে এই লিংকে যান। লিংকটা ছিল আসলে একটা কী লগার। একজন সেটা ডাউনলোড করে। ফলে তার কম্পিউটারে কী লগার ইন্সটল হয়ে যায়।

 

এতদিন তার থেকে হিবিজিবি কিছু ছাড়া তেমন তথ্য পাচ্ছিলাম না। কিন্তু গতকাল দুপুরে সে কার সাথে যেন স্কাইপে চ্যাট করে। তার চ্যাট হিস্ট্রি থেকে এটুকু জানতে পারি যে একজন গাইড মামুন সেজে আমার বন্ধু প্রদোষ মিত্রকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাবে। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে একটা নির্জন জায়গায় নিয়ে ফেলুদাকে সারেন্ডার করতে বাধ্য করা হবে। কোথায় গিয়ে ছদ্মবেশী মামুন অস্ত্র বের করবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনাও ছিল। আমি চাইলে আগেই তাদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি সুস্পষ্ট প্রমাণসহ হাতেনাতে ধরতে চেয়েছি। আজ সকালে যখন ওরা বেরিয়ে যায় পিছন পিছন আমিও রিভলভার নিয়ে ঐ নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে গাছে উঠে অপেক্ষা করতে থাকি। জেনারেল খায়রুল বলল ব্রিলিয়ান্ট। তুমি আমার মান বাঁচিয়েছ। নইলে সেনানিবাসে কেউ বেড়াতে এসে এইভাবে খুন হলে আমাদের কেলোংকরির শেষ থাকত না।

 

আদনান বলল জাদুঘরেরই কেউ এই চুরির সাথে জড়িত অথচ আমি সেটার কিছুই জানি না। এটা আমারই ব্যর্থতা। ওসি বলল গ্রেপ্তারকৃত রায়হানকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সব রহস্য বেরিয়ে আসবে কে পাঠিয়েছিল ওকে। নাকি ও নিজেই এই কাজ করেছে। শখের গোয়েন্দাদের কাজ এইটুকুই। এখন আপনারা তো আর এইসব তথ্য বের করতে পারবেন না। কথাগুলো তিনি ফেলুদাকে লক্ষ করেই বললেন। এসব খুন টুনের ব্যপার আসলে পুলিশের কাজ। খায়রুল বলল রিমান্ডে কি স্বীকারোক্তি দেয় তা আমাকে জানাবেন। যার নাম বলে তাকে সাথে সাথে গ্রেপ্তার করে এখানে নিয়ে আসবেন। বিদায় নিয়ে চলে গেলেন ওসি ইকরাম। কিউরেটর আদনানও চলে গেলেন। জীবন বাঁচানোর জন্য রানাকে ধন্যবাদ দিল ফেলুদা। খায়রুল বলল এখন থেকে আপনারা যেখানেই যান না কেন আপনাদের সাথে দুজন সশস্ত্র সেনা সদস্য থাকবে।

*************************

দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বিশ্রাম নিচ্ছি। ফেলুদার এখন কিছুই করার নেই। মামলা চলে গেছে পুলিশের হাতে। রিমান্ডে কি স্বীকারোক্তি দেয় তার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তারপরও ফেলুদাকে চিন্তিত মনে হচ্ছে। চেহারা গম্ভীর। ফেলুদার এই অবস্থাটা আমার খুব পরিচিত। ঝড়ের পূর্বাভাস। ফেলুদার আগে পুলিশ রহস্য সমাধান করে ফেলবে সেটা আমি কিছুতেই চাচ্ছিলাম না। খায়রুলের নিষেধ সত্ত্বেও রানা যে ভিতরে ভিতরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝা যায় আজকের তৎপরতা দেখেই। বিকেলে আমরা বাংলোর ছাদে উঠলাম। ছাদে খেলাধুলা করছে কয়েকটা কিউট পিচ্ছি। ৫ তলার উপর ছাদ। ছাদ থেকে গোটা কোটবাড়ি দেখা যায়। একটা পিচ্ছি দেখলাম ব্যাটারি থেকে স্টিলের দণ্ডে তার পেঁচিয়ে স্টিলের অপর মাথায় একটা মোটর সংযোগ দিয়েছে। নেগেটিভ লাইন অবশ্য সরাসরি ক্যাবল দ্বারা কানেক্টেড। তাতে দিব্যি মটর ঘুরছে। বুঝলাম ক্যাবল কম হওয়ায় এমন কাজ করেছে। ফেলুদা বলল এরা বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে দেখিস। আমরা ছাদের এদিক সেদিক ঘুরে কয়েকটা ফটো তুলে মাগরিবের আজানের পর রুমে ফিরে এলাম।

 

তখন রাত ৭টা। রানা আসলেন সাথে একজন লোক নিয়ে। রানার সাথে যে লোকটি এলেন তার নাম ফখরুল ইসলাম। ভদ্রলোক উঠতি লেখক। রানার গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে কয়েকটা উপন্যাস লিখে বেশ সাড়া পেয়েছেন। হাতে দুটো প্যাকেট। রানা প্যাকেট দুটো খুলে রসমালাই বের করল। বলল এতদিন সময় পাচ্ছিলাম না আপনাদেরকে কুমিল্লার বিখ্যাত মাতৃ ভাণ্ডারের রসমালাই খাওয়ানোর। আজ আমার বন্ধু ফখরুল ইসলাম আপনাদের জন্য রসমালাই নিয়ে এসেছেন। এই রসমালাই সারা বাংলাদেশে বিখ্যাত। বিদেশেও রপ্তানি হয়। বাংলাদেশের আর কোথায়ও এমন সুস্বাদু রসমালাই তৈরি হয় না। মানুষ কুমিল্লা আসলে রসমালাই না নিয়ে ফিরে যায় না। পিরিচে ঢেলে আমাদেরকে দেওয়া হল রসমালাই। খেয়েই বুঝলাম রানা মোটেও মিথ্যা বলে নি।

 

রসমালাই খাওয়া শেষে দেখলাম জটায়ুর সাথে ফখরুল ইসলামের বেশ জমে গেল। দুইজনেই লেখক বলেই কিনা এত তাড়াতাড়ি খাতির হয়ে গেল। যদিও জটায়ু অনেক আগেই জনপ্রিয় হয়েছেন। বাজারে নতুন বই আসলেই সব শেষ হয়ে যায় অল্প কদিন পরেই। ফখরুল ইসলাম বেশ রসিক মানুষ। অনেক রসালো কথা বার্তা বলেন। ফেলুদা রানাকে বলল পুলিশ থেকে কোন খবর পেয়েছেন? রানা বলল না। পেলে তো আপনিও পেতেন। অবশ্য পুলিশের এইসব রিমান্ড ফিমান্ডের উপর আমার ভরসা নাই। আপনি লাইটের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে যান। পুলিশ কি বলবে সেটা এখনই বলে দিতে পারি। পুলিশের উপর ভরসা করে বসে থাকলে অপরাধীরা আড়ালেই থেকে যাবে। তাদের ধরা সম্ভব হবে না। ফেলুদা বলল আমি তদন্ত শেষের পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। আশা করি আজ রাতে সব খটকা দূর হয়ে যাবে। রানা ও ফখরুল চলে গেল। ফখরুল ইসলাম যাওয়ার সময় তার লেখা দুইটা বই দিয়ে গেল।

 

১০ টায় ফেলুদাকে ফোন দিলেন জেনারেল খায়রুল ইসলাম। রিমান্ডে রায়হান স্বীকার করেছে তাকে পাঠিয়েছে পিটার। আমাদেরকে অপহরণ করার জন্যই তাকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু রানার তৎপরতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বুলেটও পিটারই চুরি করায়। রায়হান চুরির সাথে ছিল না। চুরি করেছে আরেকদল। পিটারকে ফোন করা হয়েছে যেন আজ রাতের মধ্যেই ফ্যাক্টরিতে ফিরে আসে। পিটার আসলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। কাল সকালে ১১ টায় আপনারা সবাই আমার অফিসে চলে আসবেন। ফেলুদার মুখে সব শুনে আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এইটা ফেলুদার এক ধরনের পরাজয়। এখন সব কিছু চলে গেছে পুলিশের হাতে। ফেলুদার কি ই বা করার আছে।  ফেলুদা রুমে পায়চারি করতে লাগল। বলল মনের সব খটকা দূর হয়ে গেছে তোপসে। বিষয়টা এখন সমূদ্রের জলের মতই ক্লিয়ার লাগছে। শুনে আমার ধরে প্রাণ ফিরে এল। বললাম খুনি কে? বুলেট কই? ফেলুদা বলল সবই আছে। কাল সব জানতে পারবি।

 

পরের দিন কাটায় কাটায় বেলা ১১ টায় আমরা গিয়ে পৌঁছলাম খায়রুলের অফিসে। জেনারেল খায়রুল, মেজর খালিদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইউসুফ, ওসি ইকরাম, মিউজিয়াম কিউরেটর আদনান, কয়েকজন পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বসে আছেন। পিটারকে গ্রেপ্তার করে আনা হয়েছে। এই প্রথম পিটারকে সামনাসামনি দেখলাম। ভদ্রলোকের গায়ের রঙ ফর্সা। চেহারা দেখে মনে হয় খাটি ইংরেজ। সবাই এসেছে। শুধু রানা আসে নি। আমরা রানার জন্য অপেক্ষা করছি। রানা এলো নির্ধারিত সময়ের ১০ মিনিট পর। সাথে ৩ জন র‍্যাব অফিসার। রানা ঢুকতেই ওসি বলল এখন সবার সামনে পিটারকে জিজ্ঞেসবাদ করা হবে। বুলেট কোথায় আছে, নাজমুলকে খুন করাতে কাদের ভাড়া করা হয়েছে সবই জানা যাবে। ওসি ইকরাম সাহেব পিটারকে লক্ষ করে বলতে লাগল এখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক উর্ধ্বতন অফিসার রয়েছেন। আশা করি সবার সামনে তুমি সত্য কথা বলবে। সত্য না বললেও তোমার সাজা মওকুফ হবে না। কারন রায়হান তোমার বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।

 

ফেলুদা বলল পিটারের হাত থেকে হাতকড়া খুলে ফেলুন। ফেলুদার এমন অদ্ভুত কথায় সবায় চমকে গেল। ওসি বলল আপনার কথা বেআইনি। আপনি সেই নির্দেশ দিতে পারেন না। ফেলুদা খুব শান্তভাবে বলল একজন নিরপরাধ ব্যাক্তিকে গ্রেপ্তার করে রাখাও কোন ধরনের আইনি কাজ নয়। ওসি সাহেব সোফা থেকে লাফিয়ে উঠলেন। আপনি এমন একজন চোর, খুনিকে নিরপরাধ বলছেন? ফেলুদা বলল হ্যাঁ নিরপরাধই। আমার মনে যা সংশয় ছিল তা কাল দূরে হয়ে গেছে। খুনিও আমাদের এখানেই উপস্থিত আছেন। এ কথা বলার পর সবার দৃষ্টি ফেলুদার দিকে ঘুরে গেল। একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। খায়রুলের নির্দেশে পিটারের হাতকড়া খুলে দেওয়া হল। ফেলুদা তার ল্যাপটপ বের করে বলা শুরু করল।

 

৩ দিন আগে ময়নামতি মিউজিয়াম থেকে মহামূল্যবান বুলেট চুরি হয়ে যায় এবং গার্ড নাজমুলকে খুন করা হয়। চুরি হওয়ার পরের দিন সকালেই আমি নাজমুলকে দেখতে হাসপাতালে যাই। সেখানে তার শেষ কথা ছিল লাই। এরপরই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে অজ্ঞান অবস্থাতাতেই তার মৃত্যু হয়। এই লাই দিয়ে সে কি বলতে চেয়েছিল তখন তা বুঝতে পারি নি। এরপর আমি জাদুঘরের সকল কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। আততায়ীর পক্ষে সামনের গেট দিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। কারন সামনের গেট রাতের বেলায় তালাবদ্ধ থাকে ভিতর থেকে। এ ছাড়া সেনারাও সার্বক্ষণিক টইল দেয়। তাই জাদুঘরের পিছনের রাস্তা দিয়ে দেওয়াল টপকে এসেছিল। যাওয়ার সময় সবাইকে কনফিউজড করার জন্য সামনের গেট খুলে দিয়ে যায়। তখনই আমার মনে হয়েছে খুনি এখানেরই কেউ। কারন বাইরের লোকের পক্ষে এখানে অস্ত্র নিয়ে ঢুকা সম্ভব না। বাইরের কেউ অস্ত্র ছাড়া আসবেও না এমন ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশন চালাতে। এ ছাড়া এখানের লোক ব্যতিত অন্য কেউ জাদুঘরের পিছনের রাস্তার কথা জানে না।

 

সবাই রুদ্ধশ্বাস হয়ে ফেলুদার কথা শুনছে। আমরা এতগুলা মানুষ থাকা সত্ত্বেও সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। ফেলুদা বলে চলল মিস্টার আদনান সাহেব আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় আপনি বলেছিলেন সেদিন সন্ধ্যায় আপনি স্বপ্ন সুপার শপে গিয়েছিলেন বাজার করতে। আমি স্বপ্নতে গিয়ে ইনভয়েস চেক করে জেনেছি সেদিন সন্ধ্যায় আদনান নামের কেউ আসে নি তাদের কাছে। আপনার অসংলগ্ন কথা বার্তা আমাকে সন্দেহে ফেলে দেয়। কিন্তু তারপরও সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ পাচ্ছিলাম না। সেদিন বার্ডে ঘুরতে গিয়ে অকস্মাৎ লালমোহনবাবু স্টিলের ঢাকনা পিছলে গর্তে পরে জান। লালমোহনবাবু না পরলে কেউ বুঝতই না এখানে একটা গর্ত আছে। তখন আমার মনে পরে যায় আপনার বাসায়ও টাইলস আলগা আলগা লাগছিল। বাসায় এমন আলগা টাইলস কেউ রাখে না। বার্ড থেকে ফিরে বিকালে আমি যাই আপনার বাসায়। তখন আপনি বাসায় ছিলেন না। গার্ডকে বলি চাবি দিতে। প্রথমে সে চাবি দিতে অস্বীকার করে। আমি বললাম জেনারেল খায়রুলকে বললে তোমার চাকরি যাবে সাথে তোমার মনিবেরও।

 

এরপর সে চাবি দিয়ে দেয়। বাসায় ঢুকেই আমি টাইলস ধরে টান দিতেই টাইলস আমার হাতের সাথে উঠে আসে। নিচে এক হাত গভীর গর্ত। তার মধ্যে পরে আছে একটা টর্চ লাইট। আপনার বাসায় পুলিশের তল্লাসির ভয় ছিল না। তারপরও আপনি অধিক সতর্কতা বশত আন্ডার গ্রাউন্ডে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমি লাইট নিয়ে টাইলস আগের জায়গায় রেখে ফিরে আসি। সেখান থেকে আরেকবার পুরো জাদুঘর পরিদর্শন করে বাংলোতে ফিরে আসি। এবার বলুন মি আদনান সাহেব আপনি সেদিন রাতে এই লাইটটি নিয়ে জাদুঘরের পিছনের রাস্তা দিয়ে দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকেন নি? আদনান প্রায় হুংকার দিয়ে বলল আমার বাসায় একটা লাইট পাওয়া মানে কিভাবে প্রমাণিত হয় আমি খুনি, চোর? এখন উল্টো আমি আপনার বিরুদ্ধে লাইট চুরির অপরাধে মামলা করতে পারি। খায়রুল ধমক দিয়ে আদনানকে থামিয়ে দিল।

 

ফেলুদা পকেট থেকে একটা কাপড়ের টুকরো বের করে বলল আরও জোরালো প্রমাণ আছে আদনান বাবু। তাকিয়ে দেখুন আপনার শার্টের পকেটের পাশে আলাদা কাপড়ে খোদাই করা আছে লাভলী টেইলা। টেইলা বলে কোন শব্দ আছে বলে আমার জানা নেই। আসলে পুরো শব্দটি হবে টেইলার্স। এবার আমার হাতের কাপড়ের টুকরোটা নিচে দিয়ে জুড়া দিয়ে দেখুন তো পুরোটা মিলে লাভলী টেইলার্স হয় কিনা? বলেই ফেলুদা উঠে গিয়ে আদনানের পকেটের পাশে কাপড়ের টুকরোটা মিলিয়ে ধরল। আমরা সবাই দেখলাম লেখাটা আসলেই লাভলী টেইলার্স হয়েছে। ফেলুদা বলল আপনার বাসা থেকে জাদুঘরে গিয়ে পিছনের দিকে এই কাপড়ের টুকরোটা কুড়িয়ে পাই। সম্ভবত দেওয়ালের কাচে ঘসা লেগে ছিড়ে গিয়েছিল। আদনানের অবস্থা দেখলাম শোচনীয়। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।

 

এবার বলি খুনটা কিভাবে করেছেন। বুলেট বিক্রির টাকার লোভ দেখিয়ে আপনি জাদুঘরের কয়েকজনকে ম্যানেজ করে নেন। কিন্তু আপনাদের কারও কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। কারন আপনাদের কাছে সেটা রাখার অনুমতি ছিল না। তাই আপনি টর্চ লাইট নিয়েই বের হন। এতে একসাথে দুই কাজ হয়। অন্ধকারে পথ দেখা যায় আবার খুনের কাজেও ব্যবহার করা হয়। আপনারা এসেছেন জাদুঘরের পিছনের রাস্তা দিয়ে। এরপর দেওয়াল টপকে ভিতরে ঢুকেন। তখন নাজমুলের দৃষ্টি ছিল সামনের দিকের গেটে। এ সময় আপনারা দুজন লোক পিছন থেকে জাপটে ধরেন যেটা নাজমুল আমাকে বলেছিল। তখন আপনি পিছন দিয়ে লাইট দিয়ে নাজমুলের মাথায় আঘাত করেন। সেটাই নাজমুল আমাকে বলতে চেয়েছিল। এই লাই হচ্ছে লাইট। কিন্তু দুর্ভাগ্য সে সেটা বলতে পারে নি।

 

ফেলুদা বলল সেদিন আপনার বাসা থেকে লাইট নিয়ে আসার পর নিশ্চয়ই আপনার গার্ড আপনাকে সব কিছু বলেছিল। আর তখন আপনি নিশ্চয়ই বাসায় গিয়ে টাইলস তুলে বুঝেছিলেন সবকিছু হাতছাড়া হয়ে গেছে। এরপর সেদিন রাত্রেই আপনি লোক ভাড়া করে জানালা ভেঙ্গে লাইট চুরি করে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমার ভাইটি জেগে থাকায় সেটা সম্ভব হয় নি। লালমোহনবাবুর মোবাইলে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো, সর্বশেষ গতকাল আমাদেরকে অপহরণ করার চেষ্টা সবই তো আপনার কাজ। তখনও আমি বুঝতে পারি নি সামান্য একটা টর্চ লাইটের জন্য আপনি কেন আমার পিছনে এভাবে লেগেছেন। সেটা বুঝেছি গতকাল সন্ধায়।

 

খায়রুল বলল খুনি ধর পরেছে। কিন্তু বুলেট টা গেল কই? ফেলুদা বলল ঐটা আমার কাছেই আছে। কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নিশ্চিত ছিলাম না বুলেট কোথায় আছে। বুলেট উদ্ধার না করে আমি তদন্তও শেষ করতে পারছিলাম না। গতকাল বিকালে বাংলোতের ছাদে গিয়ে দেখি কয়েকটা পিচ্ছি একটা স্টিলের দণ্ডে ক্যাবল বেধে দণ্ডের অপর মাথায় মোটর লাগিয়ে দিব্য মোটর ঘুরাচ্ছে। তখনই আমার মনে পরে যায় বুলেটও তো বিদ্যুৎ পরিবাহী। ছাদ থেকে বাসায় ফিরে টর্চ লাইট ভাল করে চেক করে বুঝতে পারি বুলেট আসলে লাইটের ভিতরেই আছে। বলেই ফেলুদা লাইটের ব্যাটারি খুলে ফেলল। ব্যাটারির উপরের প্ল্যাস্টিক খুলে ফেলতেই বেরিয়ে এলো সেই ঐতিহাসিক বুলেট। হাসি ফুটে উঠল খায়রুলের মুখে। ফেলুদা বলল টর্চ লাইটের মুল ব্যাটারি ফেলে দিয়ে ছোট কিন্তু অনেক শক্তিশালী ব্যাটারি লাগানো হয়। ব্যাটারির পজিটিভ টার্মিনালের সাথে বুলেট জুড়ে দিয়ে বুলেট টাকে পজিটিভ লাইন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ছোট ব্যাটারি আর বুলেট একসাথে করে উপর দিয়ে প্লাস্টিকের শেপ দেওয়া হয়। এরপর আর কারও বুঝার উপায় ছিল না যে এখানে বুলেট লুকিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক ব্যাটারি বলেই ধরে নিত সবাই। বাচ্চাদেরকে ঐসব করতে না দেখলে কখনই এটা আমার মাথাতে আসত না।

 

ক্রুদ্ধ কণ্ঠে খায়রুল বলল গ্রেপ্তার কর ওকে। রানা বলল স্যার আমারও কিছু কথা আছে। রায়হানকে রিমান্ডে নিয়ে যেই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে সেটাও ছিল ভুয়া। গতকাল র‍্যাব থানায় গিয়ে খোজ নিয়ে আমাকে জানিয়েছিল কাউকেই রিমান্ডে নেওয়া হয় নি। আদনান মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে পুলিশকে নিজের দলে নিয়ে নিয়েছে। নিজের গা বাচাতে নিরপরাধ পিটারের উপর দোষ চাপানো হয়। আদনান অবশ্য নাজমুলকে খুন না করেও বুলেট চুরি করে নিয়ে যেতে পারত। নাজমুল গার্ড হিসেবে আসার পর আদনান আর জাদুঘর থেকে কিছু সরাতে পারছিল না। তাই স্বাভাবিকভাবেই সে নাজমুলের উপর ক্ষুদ্ধ ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই খুন করে। র‍্যাব সদস্যরা খায়রুলে নির্দেশের পর কিউরেটর আদনানের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল। তাকে টেনে হিচরে র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হল। পিটারের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার মুখে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পিটার ফেলুদাকে ধন্যবাদ দিল।

 

সবাই চলে যাওয়ার পর রানা বলল সরি কিছু মনে করবেন না মিস্টার মিটার। জাদুঘর থেকে প্রায় প্রতিদিনই অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি হচ্ছিল। আমি দেখেও কিছু করতে পারছিলাম না। কারন তারা  রাজনৈতিকভাবে অনেক প্রভাবশালী। আমার নিজের জন্য চিন্তা ছিল না। কিন্তু এরা আমার ফ্যামিলিকে শান্তিতে থাকতে দিত না। এই কারনেই আপনাকে ডেকে এনে চোর ধরার ব্যবস্থা করেছিলাম। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বুলেটের কাহিনী ছিল ভুয়া। এটা আমি ৩০০ টাকা দিয়ে স্থানীয় এক ওয়ার্কশপ থেকে বানিয়ে পানিতে ফেলে রেখেছিলাম। পানির নিচে থাকার কারনে মরিচা ধরে একবারে পুরানো হয়ে যায়। সবাইকে লোভী করার জন্যই এত দাম বলেছিলাম। তাতে কাজ হয়েছে। চোর ধর পরেছে। জটায়ু বলল চোর ব্যাটায় শেষ পর্যন্ত ৩০০ টাকার জিনিষ চুরি করতে গিয়ে ধরা পরল।

 

 

 

 

 

আল্লাহ হাফেজ

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *